একজন মুক্তিযোদ্ধার উপলব্ধি

  এম এ মান্নান ২৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযোদ্ধা

মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা বিশ্বের মানব ও প্রাণীজগৎকে স্বাধীনভাবে সৃষ্টি করেছেন। একইসঙ্গে তিনি তার সব সৃষ্টিকে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করেছেন।

যখন কোনো জাতি বা গোষ্ঠী তার স্বাধীনতার অধিকার হারায়, তখন হারানো স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য তারা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করতে চায়।

যেমন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি যখন ভারতবর্ষকে অধীন করে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, স্বাধীনতাবঞ্চিত মানুষ সেই শক্তিকে পরাভূত করে তাদের হৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিকে তাড়ানোর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও পাকিস্তানের পূর্বাংশের পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আবারও শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে।

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের নিপীড়নমূলক শাসন দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানকে একদিকে শোষণ করে, অন্যদিকে এর অধিবাসী বাঙালি জাতির স্বাধীনতাও হরণ করে। ফলে শুরু হয় স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের আন্দোলন।

’৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৯- সময়ের এই বাঁকে বাঁকে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। এই প্রতিটি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এরপর ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি প্রতিষ্ঠা করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র- বাংলাদেশ। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যে আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই আদর্শ ও লক্ষ্য এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।

এক কথায় বললে ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মানবাত্মার সত্যিকারের স্বাধীনতা দীর্ঘ ৪৮ বছরেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। পরিতাপের বিষয়, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আশানুরূপ বিকশিত হতে পারেনি। সমাজে মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠাও ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় লক্ষ্য।

অথচ দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে গেলেও সমাজ থেকে বৈষম্য দূর হয়নি। মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার যে লক্ষ্য ছিল আমাদের, তা অর্জিত তো হয়ইনি, উল্টো মানবিক মূল্যবোধের সূচক নেমে গেছে অনেক। হত্যা, ধর্ষণ, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি ইত্যাদি জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে চলেছে।

৪৮ বছর পর স্বাধীনতার এই সালে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কেন আমরা সত্যিকার অর্থে একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলাম না। সেই কারণ খুঁজে বের করে নতুন উদ্দীপনায় পথ চলতে হবে। আমাদের রয়েছে সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম।

নতুন প্রজন্মকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারলে তারাই একদিন এই জাতির হাল ধরে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারবে আমাদের। বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনাময় দেশ। সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট হতে দিতে পারি না আমরা। সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সর্বপ্রথম দরকার দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। নতুন প্রজন্মের মধ্য থেকে গড়ে তুলতে হবে সেই নেতৃত্ব।

অর্থনৈতিকভাবে আমরা যতটা এগিয়েছি, তারচেয়েও অনেক বেশি আগানোর কথা ছিল। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তা হতে দেয়নি। দূর করতে হবে এই অস্থিরতা। এজন্য দরকার একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ।

সমাজে যদি গণতান্ত্রিক চর্চাটা ঠিকমতো হয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মেকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারে, তাহলে এ দেশের উন্নতি ঠেকিয়ে রাখতে পারে এমন শক্তি নেই কোথাও। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের ক্লাবের সদস্য হতে চলেছে।

২০৪০ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণ করা এমন কোনো সঠিক কাজ নয়। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, আমরা যদি সেভাবে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে পরি, তাহলে নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা লক্ষ্য পূরণ করতে পারব।

স্বাধীনতার মাসে এটাই হওয়া উচিত আমাদের ব্রত। নিছকই আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করার মধ্যে কোনো তাৎপর্য নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটাই আমার উপলব্ধি।

ইঞ্জিনিয়ার এম এ মন্নান : মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক পরিচালক, বিআরটিএ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×