বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও ডাকসু

  মারুফ ইসলাম ২৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ মূলত দুটি- এক. জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং দুই. সৃষ্ট জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়া। এই নিয়মই বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। কিন্তু বাংলাদেশই একমাত্র বিরল রাষ্ট্র, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নেতা সৃষ্টি করে।

নেতা, বিশেষত রাজনৈতিক নেতা সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কিনা এ প্রশ্ন সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে আবারও জনমনে দেখা দিয়েছে।

গুগল ঘেঁটে জানা গেল, উন্নত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন বা ইউনিয়ন আছে। সেগুলোতে নিয়মিত নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। তারা মূলত নির্বাচন করে একটি প্যানেল তৈরির প্রয়োজনে, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় যেন খেয়ালখুশি মতো শিক্ষার্থীদের ওপর টিউশন-ফি ও অন্যান্য খরচ বাড়াতে না পারে এবং শিক্ষার্থীদের কোনো ইস্যুতে সমস্যা হলে তা বলার মতো একটি প্লাটফর্ম থাকে।

সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী আনিশা ফারুক। আর ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন রে উইলিয়ামস।

কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়ে অক্সফোর্ডের উপাচার্যকে জাতীয় মিডিয়ার সামনে বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি। সেদেশের মিডিয়াকেও দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের একটি নির্বাচনকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে প্রচার করতে।

তো এই আনিশা কিংবা উইলিয়ামকে সেদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তৈরি করার জন্যই কি অক্সফোর্ড এই নির্বাচন করেছে? মোটেও না। কারণ সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো শিক্ষার্থী শাখা নেই। যারা নির্বাচিত হলেন তাদের সঙ্গে সেদেশের মূলধারার রাজনীতির কোনো যোগাযোগ নেই।

কিন্তু বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে শিক্ষার্থীদের সংগঠন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা সংগঠন হিসেবে কাজ করে। সোজা কথায় যাকে বলে লেজুড়বৃত্তি। ফলে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের চেয়ে দলের স্বার্থ প্রাধান্য পায় এসব ছাত্রসংগঠনের নেতাদের কাছে। তাই খুবই যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজন আদৌ আছে কিনা।

স্মরণ রাখা প্রয়োজন, ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগঠন এক নয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের যখন প্রয়োজন হয়, তখন তাদের একত্রিত হতে কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক প্লাটফর্মের প্রয়োজন হয় না। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদেরকে সংগঠিত করে নেয়। তার দৃষ্টান্ত আমরা ভ্যাট আন্দোলন, কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও অন্যান্য ইস্যুতে প্রত্যক্ষ করেছি। এসব আন্দোলনের নেতৃত্ব কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন তৈরি করেছিল?

পরিচিত কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তারা এত উত্তেজিত বা রোমাঞ্চিত কেন? উত্তরে তারা জানান, ‘একজন ভবিষ্যৎ নেতা উঠে আসবে এই নির্বাচন থেকে সেজন্য তারা উত্তেজিত।’ অর্থাৎ আমরা একজন নেতার জন্য অধীর অপেক্ষায় বসে আছি, আর সেই নেতা তৈরি করার জন্য শতকোটি টাকা খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছি!

বিস্ময় প্রকাশ করছি বটে, তবে এ বাস্তবতা এড়ানোর উপায় নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্রসংগঠন রেখেছে মূলত শিক্ষার্থীদের মাথায় একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ পাকাপাকিভাবে বসিয়ে দেয়ার প্রয়োজনে এবং নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রয়োজনে সংগঠনগুলোকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। এ উদ্দেশ্যে তারা যে সফল তা তো আমরা চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছি।

দিনকয়েক আগেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বিষয়ে গণশুনানি হয়ে গেল। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসলে উদ্দেশ্য কী তা নিয়েও এমন গণশুনানি বা জরিপ হওয়া উচিত বলে মনে করি। জরিপ হওয়া উচিত- বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী তথা শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করবে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি আমলা?

মারুফ ইসলাম : জনসংযোগ কর্মকর্তা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×