রাফি হত্যার তদন্ত: মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ আমলে নিন

মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ আমলে নিন

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

এ তদন্ত রিপোর্টে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা কমিটি, এমনটি খোদ জেলা প্রশাসনের অবহেলা-অপরাধের যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে বলতেই হয়- ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা’।

যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধের শিকার নিরীহ একজন ছাত্রী যদি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও যথাযথ সুরক্ষা না পায়, তাহলে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসনসহ আমাদের দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে বৈকি।

কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যদি যথাসময়ে ব্যবস্থা নিত, তাহলে রাফির মতো সাহসী একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে হারাতে হতো না। এমনকি মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে জেলা প্রশাসনের অবহেলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের অবহেলা ও অপরাধের বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।

কমিশনের রিপোর্ট যে সত্য ও বাস্তবসম্মত তার প্রমাণ পাওয়া যায় যুগান্তরেরই একটি রিপোর্টে, যেখানে বলা হয়েছে, নিপীড়ক অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতারের পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) ঘটনাটি জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, ঘটনাটি এভাবেই থাকুক এবং অধ্যক্ষকে চালান করা হোক।

একইভাবে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (এডিসি রাজস্ব) জানানো হলে তিনিও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদেরই একজনকে পরীক্ষার কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন। দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তি যে নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা করেছেন এবং তারা আন্তরিক হলে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাফি চলে গেছেন। এখন আর কোনো সান্ত্বনাই তার ভুক্তভোগী পরিবারকে শান্ত করতে পারবে না এক ন্যায়বিচার ছাড়া। আমরা মনে করি, রাফি হত্যাকাণ্ডে যারা সরাসরি জড়িত এবং যারা দায়িত্বে অবহেলা করেছে, তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই।

কেবল এমনটি করা গেলেই ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নারীর জন্য নিরাপদ করা এবং রাফি হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনার যবনিকা টানা যাবে, অন্যথায় নয়। এক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের সাতটি সুপারিশ যেমন- দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত জমা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় দ্রুত সাক্ষ্য গ্রহণ, পুলিশ ও প্রশাসনের যারা দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদ্রাসায় যারা অধ্যক্ষকে সহযোগিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদ্রাসার গভর্নিং বডি পুনর্গঠন এবং রাফির পরিবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা- ন্যায়বিচারের স্বার্থে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে অবিলম্বে।

আশার কথা, এরই মধ্যে এ মামলার অনেক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অবহেলা-অপরাধের দায়ে প্রত্যাহার করা ওসির বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অপরাধীরা ছাড় পাবে না। তারপরও আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

দেখা গেছে, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাদের প্রত্যাহারের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করা হয় এবং পরে যথারীতি অন্য স্থানে পদায়নের মাধ্যমে আবারও তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

অন্তত পরীক্ষার হলের মতো নিরাপদ স্থানে আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো জঘন্য ঘটনাটির ক্ষেত্রে এমনটি হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ইতিবাচক মানসিকতার মধ্য দিয়ে যৌন নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করার ধারা শুরু হোক ফেনীর ঘটনাটি থেকে।