স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি: মূলোৎপাটন করতে রাঘববোয়ালদের ধরুন

প্রকাশ : ০৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি: মূলোৎপাটন করতে রাঘববোয়ালদের ধরুন

যুগান্তরে চার পর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তা এক কথায় ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম স্বাস্থ্য খাত।

তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্রই চলছে দুর্নীতির প্রতিযোগিতা। মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের কেনাকাটা, নিয়োগ, পদায়ন, বদলিসহ এমন কোনো কাজ নাকি নেই, যেখানে দুর্নীতি হয় না। জানা গেছে, একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য খাত ঘিরে গড়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, নার্সিং অধিদফতর ছাড়াও প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, স্বাস্থ্য বিভাগীয় অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ সব স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে সিন্ডিকেটের সরব পদচারণা। উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অধিদফতরের বহুল সমালোচিত কর্মচারী আবজাল এ সিন্ডিকেটেরই একজন।

স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন একসূত্রে গাঁথা। সরকার স্বাস্থ্য খাতকে প্রাধান্য দিয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা, শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, শিশুমৃত্যু হ্রাস ও পরিবার পরিকল্পনাসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তবে দেখা যাচ্ছে- সরকার যেভাবে চিন্তা করছে, বাস্তবে সঠিকভাবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর একটা কারণ স্বাস্থ্য খাতে বিরাজমান দুর্নীতি।

বস্তুত এ খাতে দুর্নীতির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এ ব্যাপারে এখন আর কারও মধ্যে কোনো রাখঢাক নেই। দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়। এ খাত থেকে দুর্নীতির জঞ্জাল দূর করতে হলে দুদককে আরও কঠোর হতে হবে। আশার কথা, এ ব্যাপারে দুদক তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, তারা কোনোরকম ছাড় দেবে না।

নবনিযুক্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীও সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যেখানেই দুর্নীতি পাওয়া যাবে, সেখানেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, দুর্নীতি হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অগ্রগতি ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অন্তরায়। সুতরাং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়, যা ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর কথায় প্রকাশ পেয়েছে। স্বাস্থ্য খাতসহ দেশে বিরাজমান দুর্নীতির বিস্তৃতি রোধ করতে হলে এমন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত, যাতে দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে।

তবে শুধু আইন করে নয়, দেশ থেকে দুর্নীতি হটাতে হলে এর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। সমাজে সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাসহ নিষ্ঠাবান নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে সততা সংঘ গড়ে তোলা হয়েছে।

এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যদি দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে অবহিত হয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তবে সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল হতে বাধ্য। সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও সেবার নামে স্বাস্থ্য খাতে লুটপাট ও দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে, তার মূলোৎপাটন করতে হলে শুধু চুনোপুঁটি পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ নয়, ঠিকাদারসহ দুর্নীতির রাঘববোয়ালদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।