ফারমার্স ব্যাংক তদন্ত প্রতিবেদন

এ দুর্নীতির কোনো ক্ষমা নেই

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

ফারমার্স ব্যাংকের দুর্নীতির কথা বহুল আলোচিত হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আলাদা দুটি প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা এ ব্যাংকের ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্রই তুলে ধরে।

একটিমাত্র পরিবারই নানা দুর্নীতির মাধ্যমে এ ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। এই পরিবারের প্রধান হলেন ব্যাংকটির সাবেক প্রভাবশালী পরিচালক ও অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতী।

আলোচ্য প্রতিবেদন দুটি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়, ফারমার্স ব্যাংকে প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরনের নিয়মনীতি মানা হয়নি। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, ব্যাংক থেকে চেক-পেমেন্ট দিতে হলে লিখিত আদেশের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া টাকা তোলার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু দেখা গেছে, বাবুল চিশতীর মৌখিক আদেশেই কর্মকর্তারা শত শত কোটি টাকার লেনদেন করেছেন এবং এসব টাকার বেশিরভাগই গেছে চিশতী পরিবারের সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে।

বাবুল চিশতী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে অভিনব কৌশলও অবলম্বন করেছেন। ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন হিসাব খুলে ঋণ দেয়া হয়েছে, ঋণের অর্থ একাধিক হিসাবে নগদ বা পে-অর্ডার আকারে স্থানান্তর করে পরে নগদে তুলে নেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকে শাখা ব্যবস্থাপকরাও জড়িত বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।

ফারমার্স ব্যাংকে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জালিয়াতি ও লুটপাটের খণ্ড খণ্ড চিত্র আগেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। ব্যাংকটির পদত্যাগী চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়মের অনেক অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এবার একজন সাবেক পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকার অর্থ জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠল এবং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেই। অবাক কাণ্ড বটে, বাবুল চিশতীর মেডিকেল কলেজপড়ুয়া মেয়ের নামে ব্যাংকটির গুলশান শাখায় দুটি মেয়াদি আমানত, তিনটি মাসিক সঞ্চয় স্কিম এবং বকশীগঞ্জ জুট স্পিনার্সের মালিকানা রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, বাবুল চিশতী নিজেকে এমন ক্ষমতাধর মনে করতেন যে, তিনি কোনো কিছুই পরোয়া করতেন না।

আমরা মনে করি, বাবুল চিশতীর আর্থিক দুর্নীতির প্রতিবেদন তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তিনি এবং তার সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। ব্যাংক হচ্ছে অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর গ্রাহক হলেন এর প্রাণ। অডিট কমিটির চেয়ারম্যান যদি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেন, গ্রাহকের টাকা মেরে দিতে পারেন, তাহলে ব্যাংকিং খাত থেকে মানুষের আস্থা উঠে যাবেই। তার এবং পদত্যাগী চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। মোট কথা, তারা ব্যাংকটিকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে যথেচ্ছাচার করেছেন। এই অপরাধের কোনো ক্ষমা হতে পারে না।

বস্তুত দেশের ব্যাংকিং খাত অনিয়ম-দুর্নীতি-বিশৃঙ্খলার এক বড় চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণও ব্যাংকিং খাতের এক বড় দুষ্ট ক্ষত। নতুন এ ক্ষতটি সারানোর জন্য যেসব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, সেগুলোও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। আমরা মনে করি, নতুন অর্থমন্ত্রীকে ব্যাংকিং খাতের যাবতীয় দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তা না হলে ব্যাংকিং খাতের চরম বিপর্যয় রোধ করা যাবে না।