কবিতাই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে

  শামসুল হুদা ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘মুক্তি আসন্ন যার, তার নাম বাংলাদেশ’- অবিস্মরণীয় এই পঙক্তিটি যে কবি উচ্চারণ করেছিলেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার মাস দেড়েক আগে, তার নাম শুভ রহমান- কবি ও সাংবাদিক। তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ষাটের দশকের গোড়ায় দৈনিক সংবাদে সাব-এডিটর হিসেবে। তারপর পাকিস্তানের প্রেস ট্রাস্টের মালিকানাধীন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ প্রকাশিত হলে অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক তার সঙ্গে যুক্ত হন। শুভ রহমানও ওই পত্রিকায় যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পত্রিকাটির নাম হয় দৈনিক বাংলা। পত্রিকাটি যতদিন বেঁচে ছিল শুভ রহমান সেখানেই কাজ করেছেন সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে। সিনিয়র সাব-এডিটর এবং সম্পাদকীয় বিভাগে সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে। সরকারি মালিকানার এ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে অনেক সাংবাদিকের মতো শুভ রহমানও বেকার হয়ে পড়েন। এর পর প্রখ্যাত সাংবাদিক তোয়াব খানের নেতৃত্বে দৈনিক জনকণ্ঠ প্রকাশিত হলে তারই আহ্বানে জনকণ্ঠে যোগদান করেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। পরে জনকণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে কালের কণ্ঠে কাজ করেছেন একই পদে। সেখানেও কাজ করেন সততা ও সুনামের সঙ্গে। সব মিলিয়ে শুভ রহমানের সাংবাদিক জীবন দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের।

পেশাগত সাংবাদিক হিসেবে শুভ রহমান যেমন ছিলেন একনিষ্ঠ, সৎ ও দক্ষ, তেমনি সাংবাদিকদের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নেও ছিলেন আপসহীন। তিনি সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাংবাদিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন প্রথম সারির দক্ষ, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে শুভ রহমান সাংবাদিক মহলে সুপরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের তিনি প্রধান ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হতেন। তিনি একাধিকবার সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের কমিটিতে নির্বাচিত হয়েছেন। এক মেয়াদে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

দলমত নির্বিশেষে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী সব সাংবাদিকের কাছে শুভ রহমান ছিলেন গ্রহণযোগ্য, জনপ্রিয়। তার নিজের যেমন প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস ছিল, তেমনি ভিন্নমতের সহকর্মীদের সঙ্গেও মিশতে ও কাজ করতে কখনও তার কোনো অসুবিধা হয়নি, তার বিরল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, উদার মন ও সততার কারণে। জাতীয় দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলমের ভাষায়, ‘শুভ রহমান ছিলেন আপাদমস্তক একনিষ্ঠ সাংবাদিক।’

শুভ রহমান শুধু সমাজ ও রাজনীতি সচেতন সাংবাদিকই ছিলেন তাই নয়, তিনি ষাটের দশক থেকেই প্রগতিশীল, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। কখনও লেখালেখির মাধ্যমে, আবার কখনও বা রাজপথে। ষাটের দশকেই শুভ রহমান তার অন্যান্য সমমনা সহকর্মীকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সৃজনী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সংগঠনটি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের বছরগুলোতে অর্থাৎ ষাটের দশকে, বিশেষ করে ’৬৯-এর গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের সময় গণমানুষের অধিকারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সাংস্কৃতি অঙ্গনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে।

বেশ কয়েক মাস অসুস্থ হয়ে শয্যাবন্দি থেকে গত বছর ১৩ মে আমাদের বন্ধু, আজীবন সহযোদ্ধা শুভ রহমান এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে অদৃশ্যলোকে যাত্রা করেন। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পেরিয়ে উষ্ণতম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করছি। আমাদের মধ্যে যে সহযোদ্ধাসুলভ সখ্য গড়ে উঠেছিল তা অক্ষয় ও চির অমলিন থাকবে। শুভ রহমানের দৈহিক মৃত্যু হলেও তার চিন্তা ও আদর্শের মৃত্যু নেই, আর তার প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো কবিতাগুলো বেঁচে থাকবে অনেক অনেক যুগ, তাকেও বাঁচিয়ে রাখবে।

শামসুল হুদা : ভূমি ও মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×