পরীক্ষা ছাড়াই ড্রাইভিং লাইসেন্স!

  নাজমুল হক ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড্রাইভিং লাইসেন্স
ড্রাইভিং লাইসেন্স। ছবি: সংগৃহীত

পত্রিকায় দেখলাম ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় তিন দিনে মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের। সড়ক দুর্ঘটনা এখন আমাদের জাতীয় ব্যাধি। আর এ ক্ষেত্রে বিআরটিএ প্রতিরোধকের ভূমিকা না রেখে বরং নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে।

গত বছর ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষার জন্য চার বন্ধু একত্রে গিয়েছিলাম খিলক্ষেতের বিআরটিএ (ঢাকা উত্তর) অফিসে। আমার এক বন্ধু আগেই দালালের মাধ্যমে চারজনের লার্নার (প্রশিক্ষণার্থী) কার্ড তৈরি করে রেখেছিল। প্রশিক্ষণার্থী কার্ডে তিন ধরনের পরীক্ষা দেখে কিছুটা ভয় লাগছিল- লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক। বিআরটিএ অফিসে ঢুকলে একজন দালাল সেখানে কর্মরত বাচ্চুর (ছদ্মনাম) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল এবং বলল, আজ অনুষ্ঠিত তিনটি পরীক্ষাই সে দেখভাল করবে।

ভেতরে ঢুকতেই দেখি প্রায় ২৫০ প্রশিক্ষণার্থী পরীক্ষার অপেক্ষায় আছে। তবে তাদের মধ্যে ৮-৯ জন গাড়ি চালানোর নিয়ম-কানুনের ওপর পড়াশোনা করছে, আর বাকিরা খোশগল্পে ব্যস্ত। আমি বাচ্চুকে জিজ্ঞেস করলাম, কিসের ওপর পড়ালেখা করব? বাচ্চু বলল, একটু পরেই প্রশ্ন জানিয়ে দেব, পড়ার দরকার নেই। ২০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় বাচ্চু আগে যা জানিয়েছিল, তা-ই পরীক্ষায় এসেছে।

১০টায় লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফলাফলের জন্য অপেক্ষার ফাঁকে (চার ঘণ্টার অপেক্ষা) খিলক্ষেতে আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে বন্ধু হাসতে হাসতে বলল, লাইসেন্স করতে আবার পরীক্ষা দিতে আসতে হয়? আমি তো ৫ মাস আগে কিছু টাকা বেশি দিয়ে সরাসরি বিআরটিএ অফিসে গিয়ে ছবি তুলে ও স্বাক্ষর দিয়ে লাইসেন্স নিয়েছি। যা হোক, দুপুর ২টায় ফলাফল ঘোষণা হল। কৃতকার্য নম্বর ছিল ১২, সম্ভবত আমরা সবাই ২০-এ ২০ পেয়েছি।

তবে আফসোসের বিষয়, যে ৮-৯ জন্য পড়াশোনা করেছিল, তাদের মধ্যে তিনজন অকৃতকার্য হয়েছে! বুঝতে পারলাম এই ৮-৯ জন কোনো দালালের শরণাপন্ন হয়নি। দুপুর ২.৩০ থেকে ভাইভা শুরু। ১২০-১৩০ জনের বিশাল লাইন, অথচ ভাইভা নিচ্ছে মাত্র একজন। আমি বাচ্চুকে বললাম, কোনদিকে দাঁড়াব? বাচ্চু বলল, লাইনে দাঁড়ানোর দরকার নেই, যে কোনো এক জায়গায় গিয়ে বসেন।

১৫ মিনিট পর বাচ্চু প্রশিক্ষণার্থী কার্ডে W/T Pass লিখে নিয়ে এলো। আমি বাচ্চুকে বললাম, পরীক্ষাই তো দেইনি, পাস করলাম কিভাবে? বাচ্চু হাসল। সর্বশেষ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার জন্য রেডি হচ্ছিলাম। এর মধ্যে ঘোষণা এলো, বিআরটিএ’র নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই, তাই ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। আমি বাচ্চুর দিকে তাকাতেই বাচ্চু বলল, টেনশন করবেন না, বিকল্প ব্যবস্থা আছে। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে রেন্ট-এ-কারের ২-৩টি কার ভেতরে এলো।

তারা বিআরটিএ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জনপ্রতি ৩০০-৫০০ টাকা (৩-৪ মিনিট ড্রাইভ করিয়ে) হাতিয়ে নিল। আমি বললাম, বাচ্চু, আমার দুই বন্ধু গাড়ি চালানোয় একেবারে কাঁচা। বাচ্চু বলল, সমস্যা নাই তাদের গাড়ি চালানো লাগবে না। কিছুক্ষণ পর আমরা কার্ড পেয়ে গেলাম।

আমার প্রশিক্ষণার্থী কার্ড এবং বাকি চার বন্ধুর কার্ডে MLF/T & R/T PASS লেখা, যদিও আমরা কেউ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় অংশই নেইনি। অথচ যারা বাড়তি টাকা না দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, তাদেরকে এ সমস্যা ও সমস্যা বলে ধমকানো হচ্ছে বা ফেল করিয়ে দেয়া হচ্ছে। যখনই ২০০-৩০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে তখনই কার্ডে লিখে দিচ্ছে Pass।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাইভিং লাইসেন্স ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের, যাদের লাইসেন্স প্রাপ্তিতে ট্রাফিক আইনের ওপর এমসি কিউ ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর দৃষ্টিশক্তির পরীক্ষা দিতে হয়। এরপর আবার মেডিকেল টেস্ট দিতে হয়। কিছু দেশে দিতে হয় সাইকোলজিক্যাল টেস্ট।

৩-৪ ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ব্যবহারিক পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় মহাসড়কে গাড়ি চালিয়ে প্রমাণ করতে হয় যোগ্যতা। অথচ আমাদের লাইসেন্স প্রাপ্তির সব ধাপ পাড়ি দিচ্ছি টাকার বিনিময়ে। বস্তুত কিছু টাকার বিনিময়ে বিআরটিএ সড়কে নির্বিচারে মানুষ হত্যার লাইসেন্স দিয়ে দিচ্ছে অদক্ষ চালকদের হাতে।

নাজমুল হক : শিক্ষক ও সাংবাদিক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×