মানব পাচার রোধে চাই জিরো টলারেন্স নীতি

  আর কে চৌধুরী ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানব পাচার রোধে ২০১২ সালে মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হলেও তা ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’য় পরিণত হয়েছে। এ আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা থাকলেও গত সাত বছরে তা হয়নি। ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়ায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুসারে প্রতিটি জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচারের মামলার বিচার চলছে। এর ফলে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় পিপিরা মানব পাচার মামলার শুনানিতে আগ্রহ কম দেখান। সাক্ষী হাজির করতেও তারা গাফিলতি করেন। এ কারণে একদিকে যেমন মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, তেমনি আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় ৪ হাজার ১৭৭টি মামলার মধ্যে ৩০৪টি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন।

দক্ষিণ এশিয়ায় বছরে দেড় লাখ মানুষ পাচারের শিকার হয়। পাচারের ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া আছে মিয়ানমার। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্যানুযায়ী গত আট বছরে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অন্তত দেড় হাজার মানুষ মারা গেছে। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্র পাচারের শিকার ব্যক্তিদের বিদেশে আটক করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণও আদায় করে অনেক সময়। মানব পাচারে জড়িত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে। গত সাত বছরে এ সংক্রান্ত মামলার মাত্র ৫ শতাংশের নিষ্পত্তি হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তের সংখ্যাও নগণ্য। পাচার বন্ধে এ সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন যেমন জরুরি, তেমন পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোরতাও এখন সময়ের দাবি।

যেসব দেশ থেকে মানব পাচার হয় সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশের স্থান সেই তালিকায় প্রথম কাতারে। প্রতি বছর এ দেশ থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ পাচার হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। পাচারকারীদের লোভনীয় চাকরির ফাঁদে পা দিয়ে বিপুলসংখ্যক নারী বিদেশে পাচার হওয়ার পর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। লোভনীয় চাকরির নামে বিদেশে পাঠিয়ে যুবকদের দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচার চক্রের চোখ পড়েছে আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া ও মৌরিতানিয়ার দিকে। চক্রের খপ্পরে পড়া নরনারীদের সেখান থেকে সাগরপথে পাচার করা হচ্ছে ইউরোপের স্পেন ও ইতালিতে। এর বাইরে মানব পাচারের জন্য চক্রের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ইউরো-এশিয়ান দেশ জর্জিয়া, তুরস্ক, এশীয় দেশ ইরান এবং আফ্রিকান দেশ লিবিয়া। মানব পাচারে পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা পালন করছে কয়েকটি এয়ারলাইনসের দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। চক্রটি ই-ভিসার সুবিধায় ইউরোপে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের প্রথমে জর্জিয়া পাঠায়। এরপর তাদের তুরস্ক হয়ে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে পাঠানোর জোর চেষ্টা চালায়। বিকল্প হিসেবে অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সবকিছুই হয় চুক্তির ভিত্তিতে। বাংলাদেশি দালাল চক্রের সঙ্গে তুরস্ক ও জর্জিয়ার কিছু নাগরিক জড়িত। প্রতি বছর বিদেশে পাচারের সময় বিপুলসংখ্যক নরনারীকে উদ্ধার করা হলেও জনসচেতনতার অভাবে পাচারের ঘটনা কমছে না। ব্যাপক মানব পাচারের কারণে বাংলাদেশের নাগরিকদের উন্নত দেশগুলো ভিসা দিতে দ্বিধায় ভোগে। দেশের সুনামের স্বার্থে মানব পাচারের বিরুদ্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক, মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×