উৎসারিত হোক আলো

  লাভা মাহমুদা ২৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রিয়া সাহা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রিয়া সাহা

প্রিয়া সাহা কয়েকটি কারণে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। প্রথমত, বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে নিজ দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, বক্তব্যের ত্রুটিপূর্ণ উপস্থাপনা। এদেশের নাগরিক হিসেবে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে নালিশ করাটা শোভনীয় নয়।

হয়তো তিনি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এমনটা করেছেন। কিন্তু এটা যে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে, দেশে যে অস্থিরতা তৈরি হবে সেটা তার হিসাবে নেয়া উচিত ছিল।

অবশ্য যারা তাকে পাঠিয়েছে, তারা এ বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়েছে। যদিও দেশের রাজনৈতিক দলগুলো গোপনে বা প্রায় প্রকাশ্যে বিদেশি প্রভুদের কাছে প্রতিনিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালায়।

প্রিয়া সাহার ত্রুটিপূর্ণ উপস্থাপনাও আগুনে ঘি ঢেলেছে। তিনি ডিস্যাপিয়ারড্ শব্দটি দ্বারা কী বোঝাতে চেয়েছেন? ৩৭ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ নিখোঁজ? এটা তো অবাস্তব কথা। সংখ্যাটা হয়তো এমনই, কিন্তু শব্দটা নিখোঁজ না হয়ে হবে দেশান্তরী এবং প্রক্রিয়া শুরুর সময়কাল ১৯৪৭।

অস্বীকার করার উপায় নেই, সারা পৃথিবীতে যুগে যুগে সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত, নির্যাতিত, উপেক্ষিত, সেটা জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু যাই হোক না কেন। তাই দেশান্তরী হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জিন্নাহ-নেহেরুর ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কুফল সরাসরি ভোগ করছে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। তাই তারা যে মাইনোরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে, তা একদিনে তৈরি হয়নি।

দেশে কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রথম শিকার হয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, ক্ষেতের ফসল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়ে, শারীরিক নির্যাতন করে, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়ে তাদের দেশছাড়া করা হয়।

ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক এ কাজটা সুকৌশলে করার জন্য অস্থির রাজনৈতিক সময়ের অপেক্ষা করে সুযোগসন্ধানী মানুষ। অবশ্য শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়, আদিবাসী বা রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়।

তবে সংখালঘু জনগোষ্ঠী যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তেমনি সংখ্যাগুরুরাও ভোগে। যখন কোনো দেশে আইনের শাসন কার্যকর হয় না, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বহাল থাকে, তখন সেই ভূখণ্ডের সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। নুসরাত, রিফাত শরীফ, রানু কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীরই অংশ। এ দেশ তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারেনি ।

নিরাপত্তাহীনতার অংশ হিসেবে হিন্দু ধনিক শ্রেণির বড় একটা অংশ সম্পদের মজবুত সুরক্ষা দিতে ভারতকেই বেছে নিয়েছে। এখানেই প্রশ্ন তৈরি হয়। অথচ ২০১৮ সালে কেবল সুইস ব্যাংকেই বাংলাদেশ থেকে জমা পড়েছে ১২০০ কোটি টাকা।

বারমুডা, কেম্যান আইল্যান্ড বা লুক্সেমবার্গের মতো ট্যাক্স হেভেনগুলোর হিসাব তো পানামা পেপারসের হাতেই রয়েছে। আমরা যদি সমান্তরালভাবে দেখি তাহলে দেখব হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিছু নয়, আসল ব্যাপারটা হল সম্পদশালীরা তাদের সম্পদের সুরক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান বেছে নেয়।

সেটা হতে পারে ভারত, পানামা, সুইজারল্যান্ড বা অন্য কোথাও। দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকা কোনো জনগোষ্ঠীরই বিদেশে সম্পদ পাচারের সুযোগ নেই।

শুধু ধর্মের কারণে দুটি ভূখণ্ড যে এক থাকতে পারে না, তা একাত্তরে ফয়সালা হয়ে গেছে। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, এদেশের মাটি, পানি, বায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষ কখনই আলাদা সত্তা নয়, তারা একই হৃদয়ের অভিন্ন মানুষ। যুগে যুগে রাজনীতি ও অর্থনীতির নোংরা খেলায় পর্যুদস্ত হয়েছে জীবন, জীবনের বোধ, মর্যাদা।

আমরা শুধু মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান হতে চাই না। আমাদের আদি ও অকৃত্রিম পরিচয় বাঙালি। আমাদের সংস্কৃতি, লোকাচার, ঐতিহ্য- সবই বাঙালিত্বকে ঘিরে। এই জীবনবোধই আমাদের শেখায় ভিন্ন ধর্ম-জাতি-ভাষার মানুষের প্রতি সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা। রামুর বৌদ্ধ মন্দির ভাঙা, গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে আগুন দেয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রসরাজ নামক নিরীহ ছেলেকে ফাঁসিয়ে দিয়ে বাড়িতে-মন্দিরে আগুন দেয়ার মতো ঘটনা আর দেখতে চাই না।

মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ভাঙার ঘটনা আর একটাও না ঘটুক। কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক উসকানি কখনই দেখতে চাই না আর। অমানুষের মানসিক বৈকল্য দূর হোক, সব নির্যাতিত মানুষ বিচার পাক, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক সততার সঙ্গে।

নিরপেক্ষ আচরণ হোক সবার সঙ্গে? এ ভূখণ্ডে জন্ম নেয়া প্রত্যেক মানুষ অন্তর দিয়ে আবারও বিশ্বাস করতে শিখুক- এ দেশ আমার অহংকার।

লাভা মাহমুদা : শিক্ষক

ঘটনাপ্রবাহ : ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগ

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×