পৌরসভাগুলো ফিরে পাক প্রাণচাঞ্চল্য

  বিমল সরকার ২৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৌরসভা,

কোনো সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড জনজীবনে সীমাহীন অস্বস্তি ও দুর্ভোগ-বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন-ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর হল পৌরসভা। আমাদের দেশে অন্য অনেক কিছুর মতোই এই বন্দোবস্ত বা ব্যবস্থাটিরও প্রবর্তক ইংরেজ শাসকরা। স্বাধীনতার পর, এমনকি ১৯৮০ সাল পর্যন্তও সারা দেশে পৌরসভা ছিল ৮০টির মতো (বর্তমান ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনসহ)।

যত্রতত্র ও যখন-তখন পৌরসভা ঘোষণার প্রবণতাটি আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলেও খুব একটা আলোচনার বিষয় ছিল না। কিন্তু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর এক্ষেত্রে আমাদের ‘হুজুগে বাঙাল’ বৈশিষ্ট্যটি ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পেতে থাকে। লোকসংখ্যা, আয়তন, অবস্থান, প্রয়োজন মেটানোর মতো সুযোগ-সুবিধা, আয়-রোজগার- এ সবকিছু বিবেচনা না করেই অনেকটা মনগড়া স্বপ্নে বিভোর হয়ে একেকটি ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তরের ঘোষণা ও প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

নির্বাচনের বিষয়টিও দলীয় সরকারের মাথায় কাজ করে থাকতে পারে। একজন মেয়র এবং নয়জন কাউন্সিলর- কম কথা নয়। ইউনিয়ন থাকলে চেয়ারম্যান ও সদস্য আর পৌরসভা হলে মেয়র ও কাউন্সিলর। মর্যাদা বলেও তো একটি কথা আছে। ‘গণতান্ত্রিক সরকার’, ‘ঐকমত্যের সরকার’, ‘জোট সরকার’, ‘মহাজোট সরকার’- বলতে গেলে সব আমলেই পৌরসভা ঘোষণার হিড়িক পড়ে যায়। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাবনার সুজানগরকে দেশের ১৭৩তম পৌরসভা ঘোষণা করা হয়।

একটি উদাহরণ দিই। ১৮৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঁচটি জনপদকে (ময়মনসিংহসহ) একই ঘোষণাবলে পৌরসভা করা হয়। এগুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জ ও বাজিতপুরও রয়েছে। পরবর্তী ১৩০ বছরের ব্যবধানে (১৮৬৯-২০০০) এ অঞ্চলে (কিশোরগঞ্জ জেলায়) পৌরসভার সংখ্যা দাঁড়ায় তিন (কিশোরগঞ্জ, বাজিতপুর ও ভৈরব)।

কিন্তু বর্তমানে কিশোরগঞ্জের মোট ১৩টি থানা সদরের মধ্যে আটটিই পৌরসভার মর্যাদায় উন্নীত। একইভাবে সিটি কর্পোরেশন ছাড়াই ময়মনসিংহ জেলায় বর্তমানে পৌরসভার সংখ্যা ১০। আর এভাবেই বর্তমানে ১০টি সিটি কর্পোরেশন ছাড়াই দেশে মোট ৩২৮টি পৌরসভা রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই সরকারের এ প্রবণতায় ভাটা পড়েছে। ইদানীং পৌরসভা ঘোষণার কথা খুব একটা শোনা যায় না।

হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি সব পৌরসভারই আর্থিকসহ সার্বিক অবস্থা খুবই নাজুক। আয়-রোজগার কম। বেতন-ভাতা বাকি পড়ে আছে বছরের পর বছর। মাস্টার রোলে নিয়োগ পাওয়াদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে তারা আন্দোলনে নামেন।

হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী দিনের পর দিন রাজপথে অবস্থান করায় দেশব্যাপী পৌরসভাগুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ১৪ জুলাই থেকে বড় বড় তালা ঝুলছে একেকটি পৌরসভা কার্যালয়ে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢাকায় অবস্থান করে কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে পৌরসভার সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

সেবাপ্রত্যাশীরা নাগরিকতা সনদ, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যুসনদ, ট্রেড লাইসেন্স ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গিয়ে দুর্ভোগ, বিড়ম্বনা ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার থেকে নিয়ে পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ, ড্রেনেজ- সবখানেই নাজুক পরিস্থিতি। দেশজুড়ে নাগরিকদের দুঃসহ বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির খবর প্রতিদিন প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকলেও সমস্যা সমাধানে কেউ কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছেন না।

উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য এককভাবে কোনো সরকারকেই দায়ী করা না গেলেও সমাধান-নিষ্পত্তির দায়িত্বটি বর্তমান সরকারের ওপরই বর্তায়। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিষয়টির প্রতি সরকারের দ্রুত সুদৃষ্টি দরকার। ছাপোষা পৌরকর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে রাখা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। আমরা পৌরসভাগুলোর অচলাবস্থার নিরসন চাই।

‘চেয়ারম্যানের’ স্থলে ‘মেয়র’ আর ‘কমিশনারের’ স্থলে ‘কাউন্সিলর’ শুনতে ভালোই লাগে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনেরও মেয়র ও কাউন্সিলর, আবার করিমগঞ্জ পৌরসভারও মেয়র ও কাউন্সিলর। সবার ভালো লাগারই কথা। তবে কেবল বাইরে নয়, ভেতরের দিকেও নজর দিতে হবে। পৌরকর্মীদের আসল পরিস্থিতিটি জানতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাকি-বকেয়া পরিশোধসহ তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়া মেনে নেয়া হোক। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মতৎপরতায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাক পৌর শহরগুলো। স্বস্তি-স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসুক নাগরিকদের মাঝেও।

বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×