লঘুর অভিমান, গুরুর অহং

  হাবিবুর রহমান ২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে দেশময় হইচই হলেও এটি নিয়ে মাঠ গরম করা অহেতুক। কারণ এ ধরনের অভিযোগ ইতিপূর্বে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মুখ থেকেও শোনা গেছে।
ফাইল ছবি

প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে দেশময় হইচই হলেও এটি নিয়ে মাঠ গরম করা অহেতুক। কারণ এ ধরনের অভিযোগ ইতিপূর্বে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মুখ থেকেও শোনা গেছে।

রাজনৈতিক নেতারা বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের বিষয়ে একাধিকবার নালিশ করেছেন- কখনও সাহায্য-সহায়তা বন্ধ করতে, কখনও সরকারকে বয়কট করতে।

কোনোটাতেই তেমন ফল আসেনি। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো তাদের মর্জিমতোই বাংলাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই প্রিয়া সাহার অভিযোগ আমলে নেয়ার মতো তেমন কোনো মেরিট আছে বলে মনে হয় না।

যে অভিযোগ প্রিয়া করেছেন, তার একটি বড় অংশ বেশ পুরনো, যার দায় বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের কোনো সরকারের নয়। ’৪৭-পরবর্তী হিন্দুদের দেশত্যাগের দায় কোনোভাবে বাংলাদেশের কোনো সরকারের ওপর বর্তায় না।

এর দায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের। এটি একটি তামাদি বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিটি সরকার হিন্দুদের দেশত্যাগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিলে গড়িমসি অনেক হিন্দুকে দেশত্যাগে উৎসাহিত করেছে। অনেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণেও দেশত্যাগ করে ভারতে গেছেন।

আবার অনেকে গেছেন সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখে। যেমন বাংলাদেশের অনেক মুসলমান ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড পাড়ি জমিয়েছেন উন্নত ভবিষ্যতের আশায়।

এখন প্রশ্ন হল, বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এদেশের কোনো বিষয়ে অভিযোগ করতে পারেন কিনা। প্রিয়ার অভিযোগ যদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়ে থাকে বাংলাদেশের আইনে, তাহলে যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হল, ইতিপূর্বে যারা এ আইন ভঙ্গ করেছেন তাদের কী হয়েছিল?

যা হোক, একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতা হিসেবে প্রিয়াকে অর্বাচীন বলতেই হবে। যে ভঙ্গিতে ও যে ভাষায় তিনি ট্রাম্পের কাছে নালিশ করলেন, তা অনেকটা গ্রাম মাতব্বরের কাছে একজন অশিক্ষিত ছিচকাঁদুনে নারীর নালিশের মতোই মনে হয়েছে। প্রিয়া সাহার যে বিষয়টি বিবেচনায় আনা উচিত ছিল তা হল, তিনি একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ডিল করছেন, যার সঙ্গে জড়িত একটি দেশ, দেশের সরকার এবং সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়।

এটিকে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু বলা যায়। প্রিয়ার এই কর্ম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কী উপকার করল? সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের সমস্যা। ভারত, মিয়ানমার, চীন, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা- সর্বত্রই সংখ্যালঘু নিপীড়নের সমস্যা বিদ্যমান। আমেরিকায় কালো মানুষরা, ল্যাটিন ও মুসলিমরা বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

প্রিয়া সাহার কর্মকাণ্ডের জন্য অনেকেই অতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ কেউ এজন্য পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন, যা অন্যায় ও অন্যায্য। সব মুসলিম যেমন হিন্দু-নিপীড়ক নয়, তেমনি সব হিন্দু মুসলিম-বিদ্বেষী নয়।

প্রিয়া সাহার মতো মানুষ সব সম্প্রদায়েই আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ করার আগে ভাবতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে, হত্যার শিকার হয়েছেন নির্বিচারে এবং অসংখ্য হিন্দু নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ যেন আমরা কোনোভাবে খাটো না করি।

আমাদের সচেতন থাকা দরকার, দেশের স্বার্থ মানেই সংখ্যাগুরুর স্বার্থ নয়, সংখ্যালঘুদেরও স্বার্থ ও অধিকার। প্রিয়া সাহাকে জবাবদিহিতার আওতায় অবশ্যই আনতে হবে, তবে তা যেন সংখ্যাগুরুর অহংয়ের কারণে না হয়। বরং তা যেন হয় নিখাদ দেশের স্বার্থে।

হাবিবুর রহমান : সমাজকর্মী ও প্রাবন্ধিক

ঘটনাপ্রবাহ : ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগ

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×