তিতাস ভবনে তিতাস নেই

  আমিনুল ইসলাম মিলন ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

তিতাস ভবনে তিতাস নেই। তিতাসের প্রাণপাখি উড়ে গেছে। ফুটফুটে ১১ বছরের বালক তিতাস এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ছোটবেলায় বাবা মারা যান।

বড় শখ করে তিতাসের বাবা বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘তিতাস ভবন’। তিতাস বড় হবে, সংসার হবে, এ ভবনেই থাকবে। ছোট্ট উঠানজুড়ে খেলে বেড়াবে তার সন্তানরা। কিন্তু না, বিধি হয়তো তা চায়নি। সম্প্রতি এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয় তিতাস। খুলনা হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেন।

৫০ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকার পথে রওনা হন স্বজনরা। কাঁঠালবাড়ি ঘাটে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৮টা। দ্রুত তাকে ঢাকা নিতে হবে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কিন্তু ফেরি ছাড়ছে না।

স্বজনদের শত আকুতি-মিনতিতেও ঘাট কর্তৃপক্ষের মন গলেনি। মাদারীপুরের ডিসি সাহেবের নির্দেশ- ‘ভিআইপি’ না এলে ফেরি ছাড়া যাবে না। এদিকে তিতাস প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে স্বজনদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অবশেষে ‘ভিআইপি’ এলেন। ফেরি ছাড়ল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১১টা পেরিয়ে গেছে। পাক্কা তিন ঘণ্টা বিলম্ব। কিন্তু তিতাসকে বাঁচানো গেল না।

মনে পড়ে ১৯৭১ সালের কথা। তখন অবিভক্ত নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল করিম। মার্চের শেষদিকে (কিংবা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে) নোয়াখালী জেলা ট্রেজারি থেকে তার হাত দিয়েই একটি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল গ্রহণ করি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রশাসনের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন সামরিক শাসনের সময় প্রশাসনকে হীন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। এতে প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তা জনবিচ্ছিন্ন কার্যক্রমে উৎসাহিত হয়ে পড়ে।

তবে এখন অবস্থা পাল্টেছে। এখন প্রশাসন মানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। জনগণের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে- একথা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করুক এবং সে অনুযায়ী কাজ করুক, এটাই জনপ্রত্যাশা। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় প্রশাসন এখন দক্ষ ও গতিশীল। চলতি বন্যা ও ডেঙ্গু সংকটে এর প্রমাণ মেলে।

তবে দুখঃজনক হলেও সত্য, একশ্রেণির সংকীর্ণমনা কর্মকর্তার কারণে পাকিস্তান আমলের মতো স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেশ প্রকট।

জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য পেশাজীবী এর ভুক্তভোগী। যার জন্য অনেক সময় সরকারি কাজে সার্বিক সমন্বয় হচ্ছে না। আমাদের প্রশাসন ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা ভুলে যান, যারা বুয়েট/মেডিকেলে চান্স পায়, তারা তাদের চেয়ে কম মেধাবী তো নয়ই বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি মেধাবী।

প্রশাসন বলতে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে বোঝায়। বাংলাদেশে প্রশাসন ক্যাডারের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার আধিপত্যমূলক মানসিকতার কারণে ‘প্রশাসন’ শুধু প্রশাসন ক্যাডারেই সীমাবদ্ধ আছে। আমি শতভাগ নিশ্চিত, যদি ওই যুগ্মসচিব, যিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের Access to information প্রকল্পে কর্মরত, তার কাছে এ তথ্যটি যেত যে, ফেরিতে একজন মুমূর্ষ রোগী আছে, তাহলে তিনি কখনই তার জন্য ফেরির অপেক্ষমাণ থাকা অনুমোদন করতেন না।

হয়তো ওই যুগ্মসচিব এসবের কিছুই জানতেন না। কিন্তু যে ক্ষতি হয়ে গেল তার দায় তার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পড়ে গেল। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নাম পাল্টে রাখা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

জাতি আশা করে, বাংলাদেশের প্রশাসন জনকল্যাণে, জনস্বার্থে, জনসেবায় সৎ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সূদৃঢ়ভাবে তুলে ধরবে।

কেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক এ বেআইনি নির্দেশ দিলেন? কেন ঘাট কর্মকর্তারা এ অন্যায় আদেশ পালন করলেন? কেন ৯৯৯-তে ফোন করার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর কি জাতি জানতে পারবে? নাকি জোয়ার-ভাটার বাংলাদেশে এ ঘটনাও ভাটার টানে সাগরের মোহনায় চিরতরে হারিয়ে যাবে?

আমিনুল ইসলাম মিলন : সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×