ভাটি বাংলার বাউল কবি শাহ আবদুল করিম
jugantor
স্মরণ
ভাটি বাংলার বাউল কবি শাহ আবদুল করিম

  সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান  

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শাহ আবদুল করিম
শাহ আবদুল করিম। ছবি-সংগৃহীত

বাংলাদেশের সর্বশেষ বাউল সম্রাট হিসেবে যাকে অভিহিত করা হয়, তিনি হলেন ভাটি বাংলার বাউল কবি শাহ আবদুল করিম। গানের আসরে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক গান বাঁধার মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি।

যে কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি যেমন তাৎক্ষণিক গান বাঁধতে পারতেন, তেমনি দক্ষ সুরকারের মতো সুরারোপ করে একতারা বা দোতারা বাজিয়ে গান গাইতেন।

এমন বিরল প্রতিভার গুণেই তিনি গ্রামবাংলার মানুষের মাঝে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার জনপ্রিয়তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বের বাঙালির কাছে ছড়িয়ে পড়ে।

শাহ আবদুল করিম শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, দেশাত্মবোধক ও বাউল গানসহ গানের বিভিন্ন শাখায় সাবলীল বিচরণ করেছেন। তিনি দেড় সহস্রাধিক গান রচনা ও তাতে সুরারোপ করেছেন। দোতারা হাতে তিনি সারাটা জীবন অসাম্প্রদায়িক ও মেহনতি মানুষের পক্ষে লড়াই করে গেছেন।

তিনি একজন গণসংগীত শিল্পীও ছিলেন। মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য গণসংগীত রচনা করেছেন। তিনি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য লাভ করেছিলেন।

শাহ আবদুল করিমের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রচিত গানগুলো এখনও আমাদের ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করে। দেশে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রসঙ্গে কোনো কথা উঠলে সর্বপ্রথম মনে পড়ে যায় করিমের সেই বিখ্যাত গান- ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান / মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম / আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।’

এ গানের মাঝে নিহিত আছে হাজার বছরের বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন। অপর একটি গানে তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু-মুসলিম এটা বড় নয় / আমরা বাঙালি, আমরা মানুষ।’ তার এমন বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গান আছে, যা বাঙালির আচার অনুষ্ঠানে সমাদৃত। তিনি যা উপলব্ধি করতেন, তা-ই রচনা করে গাইতেন।

শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইব্রাহিম আলী ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক, মাতা নাইওরজান বিবি ছিলেন গৃহিণী। শাহ আবদুল করিম বাল্যকালে শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ পাননি।

বারো বছর বয়সে তিনি নিজ গ্রামের এক নৈশ বিদ্যালয়ে কিছুকাল পড়াশোনা করেন। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে নিজের চেষ্টায় তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। দারিদ্র্র্য ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। তার দাদা নসীবউল্লার বাউল সত্তাই তার মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল প্রথম।

দাদার মুখে আধ্যাত্মিক গান ‘ভাবিয়া দেখ তোর মনে / মাটির সারিন্দারে বাজায় কোনজনে’ শুনেই গানের প্রতি দরদ অনুভব করেন তিনি। একতারায় সুর তোলার শিক্ষা পেতে দূরে যেতে হয়নি, দাদার কাছেই শৈশবে এ শিক্ষা নিয়েছিলেন।

এভাবেই পথ চলতে চলতে কিশোর করিম যৌবনে পা দিয়ে হয়ে যান বাউল আবদুল করিম। তার মোট সাতটি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। শাহ আবদুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক, রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, লেবাক অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার।

এই বাউল সম্রাট ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যবরণ করেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও তার অমর সৃষ্টি তাকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল। মৃত্যুদিবসে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান : কবি ও প্রাবন্ধিক

স্মরণ

ভাটি বাংলার বাউল কবি শাহ আবদুল করিম

 সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান 
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শাহ আবদুল করিম
শাহ আবদুল করিম। ছবি-সংগৃহীত

বাংলাদেশের সর্বশেষ বাউল সম্রাট হিসেবে যাকে অভিহিত করা হয়, তিনি হলেন ভাটি বাংলার বাউল কবি শাহ আবদুল করিম। গানের আসরে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক গান বাঁধার মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি।

যে কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি যেমন তাৎক্ষণিক গান বাঁধতে পারতেন, তেমনি দক্ষ সুরকারের মতো সুরারোপ করে একতারা বা দোতারা বাজিয়ে গান গাইতেন।

এমন বিরল প্রতিভার গুণেই তিনি গ্রামবাংলার মানুষের মাঝে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার জনপ্রিয়তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বের বাঙালির কাছে ছড়িয়ে পড়ে।

শাহ আবদুল করিম শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, দেশাত্মবোধক ও বাউল গানসহ গানের বিভিন্ন শাখায় সাবলীল বিচরণ করেছেন। তিনি দেড় সহস্রাধিক গান রচনা ও তাতে সুরারোপ করেছেন। দোতারা হাতে তিনি সারাটা জীবন অসাম্প্রদায়িক ও মেহনতি মানুষের পক্ষে লড়াই করে গেছেন।

তিনি একজন গণসংগীত শিল্পীও ছিলেন। মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য গণসংগীত রচনা করেছেন। তিনি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য লাভ করেছিলেন।

শাহ আবদুল করিমের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রচিত গানগুলো এখনও আমাদের ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করে। দেশে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রসঙ্গে কোনো কথা উঠলে সর্বপ্রথম মনে পড়ে যায় করিমের সেই বিখ্যাত গান- ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান / মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম / আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।’

এ গানের মাঝে নিহিত আছে হাজার বছরের বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন। অপর একটি গানে তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু-মুসলিম এটা বড় নয় / আমরা বাঙালি, আমরা মানুষ।’ তার এমন বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গান আছে, যা বাঙালির আচার অনুষ্ঠানে সমাদৃত। তিনি যা উপলব্ধি করতেন, তা-ই রচনা করে গাইতেন।

শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইব্রাহিম আলী ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক, মাতা নাইওরজান বিবি ছিলেন গৃহিণী। শাহ আবদুল করিম বাল্যকালে শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ পাননি।

বারো বছর বয়সে তিনি নিজ গ্রামের এক নৈশ বিদ্যালয়ে কিছুকাল পড়াশোনা করেন। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে নিজের চেষ্টায় তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। দারিদ্র্র্য ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। তার দাদা নসীবউল্লার বাউল সত্তাই তার মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল প্রথম।

দাদার মুখে আধ্যাত্মিক গান ‘ভাবিয়া দেখ তোর মনে / মাটির সারিন্দারে বাজায় কোনজনে’ শুনেই গানের প্রতি দরদ অনুভব করেন তিনি। একতারায় সুর তোলার শিক্ষা পেতে দূরে যেতে হয়নি, দাদার কাছেই শৈশবে এ শিক্ষা নিয়েছিলেন।

এভাবেই পথ চলতে চলতে কিশোর করিম যৌবনে পা দিয়ে হয়ে যান বাউল আবদুল করিম। তার মোট সাতটি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। শাহ আবদুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক, রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, লেবাক অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার।

এই বাউল সম্রাট ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যবরণ করেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও তার অমর সৃষ্টি তাকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল। মৃত্যুদিবসে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান : কবি ও প্রাবন্ধিক