র‌্যাংকিংয়ে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ কোথায়?

  মাহমুদা লাভা ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাবি

‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠাঁই হয়নি সেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়। লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ প্রতি বছর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে র‌্যাংকিং প্রকাশ করে তাতে এ বছর ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই।

৯২টি দেশের ১৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আছে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। অথচ সেরা ১০০০-এর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ভারতের ৩৬টি, পাকিস্তানের সাতটি এবং শ্রীলংকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়।

২০১৬ সালের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানক্রম ৬০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে ছিল। সে হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়েছে প্রায় ৪০০ ধাপ। গত মে মাসে সাময়িকীটি এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে তালিকা করেছিল সেখানেও ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটিও ছিল না ।

শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম, প্রকাশিত গবেষণার সাইটেশন বা উদ্ধৃতি, এ খাত থেকে আয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতা- এমন পাঁচটি বিষয়কে মানদণ্ড ধরে টাইমস হায়ার এডুকেশন এ তালিকা প্রকাশ করেছে।

শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে আমাদের দেশে সাধারণের মধ্যেও ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে এবং সেটা যে অমূলক নয়, এই তালিকা তারই প্রমাণ। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি ঘটছে।

ছাত্রের অনুপাতে শিক্ষকস্বল্পতা, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া, শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পদায়ন-পদোন্নতি সব ক্ষেত্রেই মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকেই প্রাধান্য দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার মানের এই অবনতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের পদটি শুধু দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় দেয়া হয়। শিক্ষকরা নানা দলে, রঙে বিভক্ত হয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত। আন্তর্জাতিক মানের সাময়িকীতে লেখা প্রকাশ, উন্নত গবেষণা ইত্যাদি এখন আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

শিক্ষকদের গবেষণাগার যতটা না টানে তার চেয়ে বেশি টানে রাজনৈতিক ‘বস’দের সঙ্গ-সান্নিধ্য। ছাত্রসংগঠনগুলো ঐতিহ্য হারিয়ে শিক্ষার উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন না করে টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজির মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, যা সামগ্রিকভাবে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার পথে অন্তরায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কাজের জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ নেই। যেটুকু আছে সেটুকুও ভালোভাবে কাজে লাগছে না। নিয়ম রক্ষার কিছু প্রকাশনা প্রকাশ করে মাত্র, তাও মানসম্পন্ন নয়। শিক্ষক-ছাত্ররা কত কিছু নিয়ে আন্দোলন করে; কিন্তু কখনও দেখা যায় না গবেষণার বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করতে।

কিছু ব্যতিক্রমী শিক্ষক বা ছাত্র যে নেই, তা বলা ঠিক হবে না। কিন্তু ব্যতিক্রম দিয়ে দেশের রুগ্ন শিক্ষার চিকিৎসা করানো যাবে না। উচ্চশিক্ষার এ দুরবস্থা শুধু দুঃখজনক নয়, লজ্জারও। পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র, যাদের আমরা সভ্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে নারাজ, সেখানেও সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে।

অথচ আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করে জরিপের যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। এই আত্মঘাতী প্রবণতা আমাদের আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবে। উটপাখির মতো বালিতে মুখ লুকিয়ে ঝড় নাও দেখতে পারি; কিন্তু তাতে তো ঝড় থামবে না।

বরং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পড়াশোনার সুশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠবিমুখতা দূর করতে হবে। ভালো মানুষ গড়ার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে হবে। গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে ও মানসম্পন্ন গবেষণা হতে হবে।

বিদেশি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে গবেষণাধর্মী আন্তঃযোগাযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের বেতনভাতাও বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনা, স্বজনপ্রীতি বা অন্য কোনো অনিয়মের মাধ্যমে মেধাহীন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশই উন্নত শিক্ষা ছাড়া আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারেনি, আমাদের ক্ষেত্রেও সম্ভব নয়।

তাই নতুন করে মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না বাড়িয়ে পুরনোগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেও অন্তত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেন টিকতে পারি।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এই আপ্তবাক্য এখন অসার হতে বসেছে। উপযুক্ত অর্থাৎ মানসম্পন্ন শিক্ষা না থাকলে মেরুদণ্ড বেঁকে যাবে, পুরো জাতি মুখ থুবড়ে পড়বে। উচ্চশিক্ষার বিপর্যয় সামলে উঠতে না পারার মাশুল গুনতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

মাহমুদা লাভা : শিক্ষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×