নিরাপদ পানি প্রাপ্যতা: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি
jugantor
নিরাপদ পানি প্রাপ্যতা: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি

   

১২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানি শোধানাগার
পানি শোধানাগার। ফাইল ছবি

গত বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও ঢাকার সাভারে দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের উদ্বোধন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আরেকটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে সব বিভাগীয় শহরে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসের মাধ্যমে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার কেবল রাজধানী নয়, বিভাগীয় শহরগুলোতেও নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ করছে। তবে লক্ষ্য হচ্ছে, জেলা ও উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে নিরাপদ খাবার পানি পৌঁছে দেয়া।

আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে বাস্তবতা হল, কিছুদিন আগে রাজধানীসহ নারায়ণগঞ্জের নির্ধারিত এলাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক হাইকোর্টে উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে রাজধানীর ৫৯টি এলাকার পানি বেশি দূষিত বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। অবশ্য এর বাইরে আরও অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে; সেই সঙ্গে সময় সময় তীব্র পানির অভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনক হল, নিরাপদ পানির সংকট মোকাবেলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষ যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে, সে উপায়ও নেই। দেশে বাজারজাতকৃত অধিকাংশ বোতল, কনটেইনার ও প্লাস্টিক প্যাকেটের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত আয়রন, পিএইচ, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম নেই বললেই চলে; বরং এসব পানিতে লেড, ক্যাডমিমাম, কলিফর্ম ও জিংকের অস্তিত্ব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘প্রমিজিং প্রগ্রেস : অ্যা ডায়াগনস্টিক অব ওয়াটার সাপ্লাই, স্যানিটেশন, হাইজিন অ্যান্ড পভার্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির ৮০ শতাংশেই ডায়রিয়ার জীবাণুর (ই-কোলাই) উপস্থিতি রয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এলেও অনিরাপদ পানির কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ যেমন বাড়ছে; তেমনি এর ফলে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যা গভীর উদ্বেগজনক।

কিছুদিন আগে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ‘আরবানাইজেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল- বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোয় ভিড় জমাচ্ছে। রাজধানীসহ অন্যান্য শহরে অপরিকল্পিতভাবে জনসংখ্যা ও পরিসর বিস্তৃতির ফলে জীবনযাপনের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান যেমন জমি, পানি ও বাতাস সবই মাত্রাতিরিক্ত দূষিত হয়ে পড়েছে।

এর উত্তরণ ঘটাতে হলে বৈষম্য হ্রাসসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। বস্তুত আধুনিক জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে আমরা দ্রুত দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করছি। বিশেষ করে প্রাকৃতিক বনভূমি উজাড় করে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করা হচ্ছে। এর ফলে নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে এবং সংকট ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় শুধু স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপই বৃদ্ধি পায় না; এর ফলে মানুষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বিনষ্ট হয়। এ প্রেক্ষাপটে নিরাপদ পানি প্রাপ্যতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নিরাপদ পানি প্রাপ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার হারও বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

নিরাপদ পানি প্রাপ্যতা: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি

  
১২ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
পানি শোধানাগার
পানি শোধানাগার। ফাইল ছবি

গত বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও ঢাকার সাভারে দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের উদ্বোধন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আরেকটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে সব বিভাগীয় শহরে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসের মাধ্যমে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার কেবল রাজধানী নয়, বিভাগীয় শহরগুলোতেও নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ করছে। তবে লক্ষ্য হচ্ছে, জেলা ও উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে নিরাপদ খাবার পানি পৌঁছে দেয়া।

আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে বাস্তবতা হল, কিছুদিন আগে রাজধানীসহ নারায়ণগঞ্জের নির্ধারিত এলাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক হাইকোর্টে উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে রাজধানীর ৫৯টি এলাকার পানি বেশি দূষিত বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। অবশ্য এর বাইরে আরও অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে; সেই সঙ্গে সময় সময় তীব্র পানির অভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনক হল, নিরাপদ পানির সংকট মোকাবেলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষ যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে, সে উপায়ও নেই। দেশে বাজারজাতকৃত অধিকাংশ বোতল, কনটেইনার ও প্লাস্টিক প্যাকেটের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত আয়রন, পিএইচ, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম নেই বললেই চলে; বরং এসব পানিতে লেড, ক্যাডমিমাম, কলিফর্ম ও জিংকের অস্তিত্ব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘প্রমিজিং প্রগ্রেস : অ্যা ডায়াগনস্টিক অব ওয়াটার সাপ্লাই, স্যানিটেশন, হাইজিন অ্যান্ড পভার্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির ৮০ শতাংশেই ডায়রিয়ার জীবাণুর (ই-কোলাই) উপস্থিতি রয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এলেও অনিরাপদ পানির কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ যেমন বাড়ছে; তেমনি এর ফলে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যা গভীর উদ্বেগজনক।

কিছুদিন আগে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ‘আরবানাইজেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল- বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোয় ভিড় জমাচ্ছে। রাজধানীসহ অন্যান্য শহরে অপরিকল্পিতভাবে জনসংখ্যা ও পরিসর বিস্তৃতির ফলে জীবনযাপনের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান যেমন জমি, পানি ও বাতাস সবই মাত্রাতিরিক্ত দূষিত হয়ে পড়েছে।

এর উত্তরণ ঘটাতে হলে বৈষম্য হ্রাসসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। বস্তুত আধুনিক জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে আমরা দ্রুত দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করছি। বিশেষ করে প্রাকৃতিক বনভূমি উজাড় করে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করা হচ্ছে। এর ফলে নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে এবং সংকট ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় শুধু স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপই বৃদ্ধি পায় না; এর ফলে মানুষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বিনষ্ট হয়। এ প্রেক্ষাপটে নিরাপদ পানি প্রাপ্যতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নিরাপদ পানি প্রাপ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার হারও বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।