স্মরণ

বাঁচিয়ে রাখতে হবে তার সেবা আদর্শকে

  ড. লুৎফুন্নাহার ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী
অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী। ফাইল ছবি

দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ চিকিৎসক, সমাজসেবায় নিবেদিত অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তিনি পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের গুণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আসতে পেরেছিলেন।

দেশের স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা ক্ষেত্রে আজকের যে অগ্রগতি, ৭০-৮০ বছর আগে তা ছিল অকল্পনীয়। এ ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের ভূমিকা ছিল খুবই অপ্রতুল।

এমনই এক স্পর্শকাতর মুহূর্তে ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যার ক্ষেত্রে আলোকবর্তিতা হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন দৃঢ় পদক্ষেপে।

নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তিনি তার সারাটা জীবন আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

এদেশে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা এবং অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী একসূত্রে গাঁথা। তিনি নিঃস্বার্থভাবে মানবকল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে বিচরণ করে সার্বজনীন হয়েছেন। তিনি সেবাধর্মের আদর্শের প্রতীক।

এদেশের প্রথম মুসলিম নারী ডাক্তার ও আদর্শবান শিক্ষক হিসেবে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এবং আগামী দিনের জন্য খুবই মঙ্গলজনক।

আমার পরম সৌভাগ্য, আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজীর সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি। তিনি আমার চোখে শুধু একজন আদর্শ চিকিৎসকই নন, তিনি আমার মাতৃসমতুল্য স্নেহবৎসল সুহৃদ।

তার সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার স্মৃতিবিজড়িত দীর্ঘদিনের। কোনো বর্ণনা দিয়ে, ভাষার লালিত্য দিয়ে তার অবদানের কথা লেখা যায় না। কারণ তিনি সমুজ্জ্বল তার আকাশছোঁয়া ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতার জন্য।

তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের সুযোগ হয় ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তিনি তখন তার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট, কঠোর নিয়মনীতির নিগড়ে আবদ্ধ এবং প্রশাসনের দিক দিয়ে একজন স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সবার কাছে পরিচিত।

আমরা শুধু তাকে শ্রদ্ধাই করতাম না, রীতিমতো ভয়ও পেতাম। আমি তখন এমবিবিএস ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনের গতি চলে তার। তার প্রতিটি কার্যকলাপ ছিল কঠোর সময়ানুবর্তিতায় আবদ্ধ। ক্লাস শুরু হওয়ার পর তিনি ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ করে দিতেন।

এক মিনিট দেরি করেও কাউকে ক্লাসে ঢুকতে দিতেন না, যে কারণে সময়মতো সবাই হাজির হয়ে যেত। একটা দিনও তিনি অকারণে ক্লাস কামাই করেননি বা কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকেননি। তিনি সবসময় চাইতেন তার প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী তার বর্ণিত বিষয়টিকে যেন অন্তর দিয়ে বুঝতে পারে।

এজন্য তিনি সবসময় বিষয়ভিত্তিক আলোচনা পছন্দ করতেন এবং একজন শিক্ষার্থীও যদি তা না বুঝত, তাহলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। এ ব্যাপারে তার ছিল অসীম ধৈর্য।

ডা. জোহরা বেগম কাজী উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী ডাক্তার। এজন্য তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। কর্মক্ষেত্রে তার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে এসে তিনি দৃঢ় হাতে সব বাধা সরিয়ে এগিয়ে গেছেন সামনে।

তিনি এদেশের মানুষের মধ্যে লক্ষ করেছিলেন অন্ধকার, কুসংস্কার, শিক্ষা-কুশিক্ষা, ভাগ্যনির্ভরতা, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজের এ জঞ্জাল একদিকে একজনের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়।

তবুও কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে। তাই রোগব্যধি-জরা থেকে এ সমাজের মানুষদের, বিশেষ করে নারীদের রক্ষা করার কাজে হাত দেন।

নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, চিকিৎসাসেবা মহান পেশা; পয়সা রোজগারের জন্য নয়, মানুষের সেবা করার জন্য। সুতরাং অসহায় আর্তমানবতার সেবাই যেন হয় চিকিৎসকদের জীবনের আদর্শ।

তিনি এসব দিক লক্ষ করে গাইনি বিভাগ খোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং তারই প্রচেষ্টায় ঢাকা মেডিকেলে প্রথম ‘স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ’ খোলা হয়, যা এদেশের হতভাগ্য নারীদের জীবনে বয়ে এনেছে আশীর্বাদ।

ড. লুৎফুন্নাহার : স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×