তিনি ছিলেন আপসহীন

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মহিনউদ্দিন চৌধুরী লিটন

আজ ১০ নভেম্বর ২০১৯ বাসদের সাবেক আহ্বায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আজীবন বিপ্লবী কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের এই দিনে কানাডার সিভিক হসপিটালে মারা যান তিনি।

দেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাকে বলতে শুনি, ‘রাজনীতি করতে এসেছি ভাই, কৌশলে কথা বলতে হবে, কৌশলে চলতে হবে।’ তারা বলবেন এক কথা, করবেন উল্টোটা। আ ফ ম মাহবুবুল হক ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, মনপ্রাণ দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন তা করার। যখন ছাত্র ছিলেন, এসএসসি পরীক্ষার ফল জানার জন্য কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছিলেন। চেয়ারম্যান নাম-রোল নন্বর জেনে ফার্স্ট ডিভিশন থেকে থার্ড ডিভিশন পর্যন্ত ফলাফল দেখে বলেছিলেন, ‘চলে যাও, পাস করোনি।’ তখন তিনি চেয়ারম্যানের মুখের ওপর বলেছিলেন, ‘কুমিল্লা বোর্ডে যদি একজন ছাত্রও পাস করে তবে সেটা আমি।’ পরে চেয়ারম্যান মেধা তালিকা দেখতে গিয়ে দেখেন আ ফ ম মাহবুবুল হক বোর্ডে ৪র্থ হয়েছেন।

রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েও কোনোদিন কোনো কাজে ফাঁকি দেননি তিনি। নিষ্ঠা, সততা, সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে কাজ করতেন। যখন যে কাজটা করা দরকার সেই কাজ তখনই করে ফেলতেন। পরের দিনের জন্য রেখে দিতেন না। মাহবুব ভাই সময়ের বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দিতেন। সময়মতো মিটিংয়ে উপস্থিত না হওয়ায় বহু নেতাকর্মীকে তিনি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতে দেননি। তিনি সবসময় বলতেন, ১০টা মানে ৯টা ৫৯ মি. ৬০ সেকেন্ড।

দেশের রাজনীতির ময়দানে মাহবুব ভাই ছিলেন ব্যতিক্রমী এক মানুষ। পার্টি বা অফিস খরচের কোনো টাকা কোনোদিন তিনি বাকি রাখেননি। কেউ কোনোদিন বলতে পারেবে না মাহবুব ভাই বা দলের কাছে কারও কোনো টাকা পাওনা আছে।

মাহবুব ভাই অসুস্থ অবস্থায়ও এক সেকেন্ডের জন্য সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের কথা ভোলেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন মার্কস-লেলিন-মাও সেতুংয়ের চিন্তা ও মতাদর্শের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্রই মানবমুক্তির একমাত্র পথ। অন্য কোনোভাবে মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। মাহবুব ভাই সুবিধাবাদী রাজনীতি করেননি। কোনো সুবিধার হাওয়া বইতে শুরু হয়েছে শুনলে তিনি সেখান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। মাহবুব ভাই নিুবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু পরিবারের কথা চিন্তা করেও কোনোদিন সুবিধাবাদের আশ্রয় নেয়ার কথা ভাবেননি। যে মাহবুব ভাই ইকবাল হল থেকে রওনা দিতেন একা, মধুর ক্যান্টিনে ঢুকতেন শত শত নেতা-কর্মী নিয়ে, লাখ লাখ ছাত্র-জনতার মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই মাহবুব ভাই অল্প ক’জন সঙ্গী নিয়েও পার্টি করেছেন সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীনভাবে।

দুঃখজনক হল, জীবন বাজি রেখে যে দেশের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন, সেই দেশের মাটিতে তার জায়গা হয়নি। পরিবারের ইচ্ছায় সুদূর কানাডায় সমাহিত করা হয়েছে তাকে। সেই সময়ই আমরা পার্টির পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম।

আজ আ ফ ম মাহবুবুল হকের মতো শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বড্ড প্রয়োজন। তিনি আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু তার নীতি-আদর্শ-দর্শনের ভিত্তিতে যদি সংগঠন সঠিক সংগ্রামের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারে, তবেই তাকে যথাযথ সম্মান করা হবে। তিনি বেঁচে থাকবেন চিরদিন আমাদের মাঝে।

মহিনউদ্দিন চৌধুরী লিটন : রাজনৈতিক কর্মী