দলবাজি থেকে ডিগবাজি

  সৌমেন জানা ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতি
রাজনীতি। প্রতীকী ছবি

রাজনীতি এখন আর ঠিক আগের মতো নেই। চারদিকে কান পাতলেই একথা শোনা যাচ্ছে। একসময় নীতি-মতাদর্শ ছিল রাজনীতির প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু এখন যুগ বদলেছে। বর্তমানে ‘বাজারি অর্থনীতির’ হাত ধরে বাজারি রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

এক্ষেত্রে নীতি-মতাদর্শের মতো বিষয়গুলো গৌণ হয়ে গেছে। একটি রাজনৈতিক ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন ধরুন আধা গ্লাস জল দেখে অনেকের মনে হতে পারে গ্লাসটা অর্ধেক ভর্তি, আবার কারও মনে হতে পারে অর্ধেক খালি। আসল ব্যাপারটা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। মানুষ যখন কোনো ঘটনা দেখে তখন কিছু ব্যাপার সে দেখে, আবার কিছু ব্যাপার দেখেও দেখতে চায় না।

এই যে দৃষ্টিগোচরে আসা না আসা বা কখনও একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ করা, এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক আছে। এটি প্রকৃতপক্ষে ঘটে ব্যক্তির মনোজগতে, চিন্তায়। আত্মগতভাবে সে তার যুক্তি সাজায়। যে ব্যাপারগুলো নজরে আসে, তার পেছনে জড়িয়ে থাকে স্বতন্ত্র ভাবনা।

তবে এর সঙ্গে বুদ্ধি, আবেগও মিশে থাকে। নানা মনস্তাত্ত্বিক কারণে ইমোশনাল ডিফেন্স তৈরি হয়। যার ফলে সামনে নীল, সাদা, গেরুয়া সব রং থাকলেও সাদা-কালোটাই যেন চোখে পড়ে সবার।

মানুষ যে পুরো ঘটনাটা জানতে চায় না, তা নয়। আসলে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাপার মাথার ছাঁকনিতে ফিল্টার হয়ে আসে। ভিন্নরকম বলা, ভিন্নরকম দেখা মানে কোনো ঘটনার মধ্যে কিছু তথ্য ছাঁকনি থেকে ফিল্টার হয়ে বেরোয়। আর এই ছাঁকনিটার নাম ‘মতাদর্শ’।

এই মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থন করে। মতাদর্শ বদল হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্বাস বদল হয়ে যায়। নীতি-মতাদর্শ নিয়ে আলোচনাকে অনেকে সার-সর্বস্বহীন ‘তত্ত্বের কচকচানি’ বলেন।

রাজনীতির সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শ ও ক্ষমতার সম্পর্ক থাকে। রাজনীতিতে ক্ষমতাই যখন মূলমন্ত্র, তখন রাজনীতিকদের দলবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে রাজনীতিকদের দলবদলের তোড়জোড় বেশি দেখা যায়। তেমনি নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় রাজনৈতিক নেতাদের দলবদলের চমক দেখা যায়। লক্ষ্য নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া।

দলবদলের এই খেলা নতুন নয়। দলবদল দোষেরও নয়, অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপারও নয়। দেখার বিষয় হল, দলবদলটা করছেন কে, কোন দল থেকে কোন দলে যাচ্ছেন এবং সব থেকে বড় কথা, তা করছেন কোন সময়ে। রাজনীতিজীবীরা ইচ্ছেমতো কোনো দলে থাকতে পারেন, এক দল থেকে অন্য দলে যেতেও পারেন। কিন্তু এই দলবদল নিয়ে যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তা নিয়েই দেখা দেয় বিতর্ক।

আজ এক দলকে ভোট দিয়েছেন তো পরদিনই অন্য দলকে, এমনও হয়েছে? তবে আজকের রাজনীতিতে দলবদলের চিত্রটা অনেক আলাদা? এখন সব স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দলবদলের খেলায় সাংঘাতিক দড়?

অবশ্য দলবদলকারী নেতারা বলে থাকেন, মতের অমিল হওয়ায় এবং দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি বা তারা পূর্বতন দল ত্যাগ করে নতুন দলে যোগ দিয়েছেন। দলত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আদর্শও পরিবর্তিত হয়ে যায়।

আগে যিনি উন্নয়নের ওপর পাচনের সদর্থক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে করতে এতদিনে কয়েক টন ঘাম শরীর থেকে ঝরিয়ে ফেলেছেন, তিনি হয়ে যান খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণির কট্টর সমর্থক। ঠিক যেন ভোজবাজির খেলা। চোখের পলকে নীতি-আদর্শ সব পাল্টে যায়, বদলে যায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থানও যায় বদলে!

দলবদল শুধু জেল-জুলুম থেকে বাঁচা নয়, টেন্ডারের ভাগ পাওয়া নয়, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়ন পাওয়াও নয়; অতীতের নীতি-আদর্শ, বিশ্বাসের খোলনলচে বদলে পুরনো দেহে নতুন জীবন পাওয়া। আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে অথবা ভয়-ভীতিবশত একদিকে ধাবিত হলে গণতন্ত্রকে যে শুধু কবর দেয়া হয় তাই নয়, দেশে রাজনীতি বলেও কিছু থাকে না।

সৌমেন জানা : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×