চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ক্ষোভ: নিয়মিতদের বঞ্চনা কাম্য হতে পারে না
jugantor
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ক্ষোভ: নিয়মিতদের বঞ্চনা কাম্য হতে পারে না

  সম্পাদকীয়  

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ক্ষোভ: নিয়মিতদের বঞ্চনা কাম্য হতে পারে না
ফাইল ছবি

বছরের পর বছর দেশকে সেবা দেয়ার পরও শীর্ষ পদে থেকে অবসর নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না অনেক সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তা। এর কারণ মূলত জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক পদেই বসে আছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, কোনোমতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর কীভাবে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যায়, এ ব্যাপারে নানা কৌশল অবলম্বনে ব্যস্ত থাকেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে সরকার ও জনগণের কল্যাণে ভালো কিছু হওয়ার পরিবর্তে দু’ধরনের ক্ষতি হচ্ছে দেশ ও জনগণের।

একদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তার কাছ থেকে ভালো সেবা পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে ওই পদপ্রত্যাশী বঞ্চনার শিকার কর্মকর্তারা স্বাচ্ছন্দ্যচিত্তে কাজ করতে পারেন না। অবশ্য সবার ক্ষেত্রেই যে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তেমনটি নয়।

কোনো কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার মেধা, যোগ্যতা ও দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সেবা দেয়ার মানসিকতার কারণে সরকারই তাকে রেখে দিতে চায়; কিন্তু মনে রাখতে হবে, এমন কর্মকর্তা হাতে গোনা দু-একজনের বেশি নয়। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

জানা যায়, ডিসেম্বরে ১০ জনসহ পরবর্তী তিন মাসে ১৯ জন সচিব অবসরে যাচ্ছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিন প্রশাসনে সেবা দেয়া অতিরিক্ত সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবরা শীর্ষ পদ পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এবং এটি তাদের অধিকারও।

এ ক্ষেত্রে যদি অবসরের পথে থাকা বেশিরভাগ সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে বা আগে থেকেই চুক্তিভিত্তিক থাকায় পুনরায় চুক্তি নবায়নের জন্য চেষ্টা-তদবির করেন (এরই মধ্যে অনেকে তা করছেন), তবে নিয়মিত কর্মকর্তাদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত এক্সট্রা-অর্ডিনারি না হলে অবসরে যাওয়াদের চুক্তিভিত্তিক ও চুক্তিভিত্তিকদের চুক্তি নবায়নের বিষয়টি আমলে না নেয়া। কারণ জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অতিরিক্ত সচিব পদে ৫৯৪ জনের বিশাল একটি সংখ্যা রয়েছে। এ ছাড়া উচ্চপর্যায়ের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পদের চেয়ে অনেক বেশি ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে রয়েছেন।

পদে ‘উপরে’ হলেও সংখ্যাধিক্যের কারণে ‘নিচের’ পদে কাজ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বোঝা আসে তবে পরিস্থিতি যে আরও জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।

নিয়মিত আমলারা যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, তা বোঝা যায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ৮ম সভায়।

তাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- ‘অত্যাবশ্যকীয় কারণ ব্যতীত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান না করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হবে।’ জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের উচিত, আমলাদের বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা।

জনপ্রশাসন একটি চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ফলে এতে মেধাবীদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিক পছন্দ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কাছের মানুষকে নিয়োগ খুব কমই ফলপ্রসূ হয়।

এ কারণে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উচ্চপর্যায়ের নিয়োগ নিশ্চিত করাই যৌক্তিক, চুক্তিভিত্তিক নয়। এটি সত্য, কারিগরি ও প্রফেশনাল বিভিন্ন উচ্চপদে অধিকতর যোগ্য এবং মেধাবীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রয়োজন আছে।

এতে জনগণের কল্যাণের বিষয় রয়েছে। পছন্দের কম মেধাবীকে চুক্তিতে আনা ও অপছন্দের মেধাবীদের বিদায় করার নীতির বদলে জনগণ তথা দেশের সার্বিক কল্যাণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করে দ্রুত নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ক্ষোভ: নিয়মিতদের বঞ্চনা কাম্য হতে পারে না

 সম্পাদকীয় 
০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ক্ষোভ: নিয়মিতদের বঞ্চনা কাম্য হতে পারে না
ফাইল ছবি

বছরের পর বছর দেশকে সেবা দেয়ার পরও শীর্ষ পদে থেকে অবসর নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না অনেক সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তা। এর কারণ মূলত জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক পদেই বসে আছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, কোনোমতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর কীভাবে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যায়, এ ব্যাপারে নানা কৌশল অবলম্বনে ব্যস্ত থাকেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে সরকার ও জনগণের কল্যাণে ভালো কিছু হওয়ার পরিবর্তে দু’ধরনের ক্ষতি হচ্ছে দেশ ও জনগণের।

একদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তার কাছ থেকে ভালো সেবা পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে ওই পদপ্রত্যাশী বঞ্চনার শিকার কর্মকর্তারা স্বাচ্ছন্দ্যচিত্তে কাজ করতে পারেন না। অবশ্য সবার ক্ষেত্রেই যে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তেমনটি নয়।

কোনো কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার মেধা, যোগ্যতা ও দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সেবা দেয়ার মানসিকতার কারণে সরকারই তাকে রেখে দিতে চায়; কিন্তু মনে রাখতে হবে, এমন কর্মকর্তা হাতে গোনা দু-একজনের বেশি নয়। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

জানা যায়, ডিসেম্বরে ১০ জনসহ পরবর্তী তিন মাসে ১৯ জন সচিব অবসরে যাচ্ছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিন প্রশাসনে সেবা দেয়া অতিরিক্ত সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবরা শীর্ষ পদ পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এবং এটি তাদের অধিকারও।

এ ক্ষেত্রে যদি অবসরের পথে থাকা বেশিরভাগ সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে বা আগে থেকেই চুক্তিভিত্তিক থাকায় পুনরায় চুক্তি নবায়নের জন্য চেষ্টা-তদবির করেন (এরই মধ্যে অনেকে তা করছেন), তবে নিয়মিত কর্মকর্তাদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত এক্সট্রা-অর্ডিনারি না হলে অবসরে যাওয়াদের চুক্তিভিত্তিক ও চুক্তিভিত্তিকদের চুক্তি নবায়নের বিষয়টি আমলে না নেয়া। কারণ জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অতিরিক্ত সচিব পদে ৫৯৪ জনের বিশাল একটি সংখ্যা রয়েছে। এ ছাড়া উচ্চপর্যায়ের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পদের চেয়ে অনেক বেশি ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে রয়েছেন।

পদে ‘উপরে’ হলেও সংখ্যাধিক্যের কারণে ‘নিচের’ পদে কাজ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বোঝা আসে তবে পরিস্থিতি যে আরও জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।

নিয়মিত আমলারা যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, তা বোঝা যায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ৮ম সভায়।

তাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- ‘অত্যাবশ্যকীয় কারণ ব্যতীত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান না করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হবে।’ জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের উচিত, আমলাদের বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা।

জনপ্রশাসন একটি চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ফলে এতে মেধাবীদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিক পছন্দ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কাছের মানুষকে নিয়োগ খুব কমই ফলপ্রসূ হয়।

এ কারণে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উচ্চপর্যায়ের নিয়োগ নিশ্চিত করাই যৌক্তিক, চুক্তিভিত্তিক নয়। এটি সত্য, কারিগরি ও প্রফেশনাল বিভিন্ন উচ্চপদে অধিকতর যোগ্য এবং মেধাবীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রয়োজন আছে।

এতে জনগণের কল্যাণের বিষয় রয়েছে। পছন্দের কম মেধাবীকে চুক্তিতে আনা ও অপছন্দের মেধাবীদের বিদায় করার নীতির বদলে জনগণ তথা দেশের সার্বিক কল্যাণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করে দ্রুত নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।