স্বমূর্তিতে নোবেলজয়ী

এই মিথ্যাচারের কোনো ক্ষমা নেই

  সম্পাদকীয় ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক আদালতে রাখাইনে গণহত্যার দায় অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। ইসলামিক অর্গানাইজেশন অফ কো-অপারেশনের (ওআইসি) পক্ষে গাম্বিয়ার করা মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে নোবেলজয়ী সু চি যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা সমগ্র বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।

বস্তুত তার বক্তব্য নির্লজ্জ মিথ্যাচার বৈ অন্যকিছু নয়। বক্তৃতায় তিনি মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন; বলেছেন- রাখাইনে যা হয়েছে তা গণহত্যা নয়। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যুদ্ধাপরাধ করে থাকতে পারে; কিন্তু ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ অনুযায়ী তা গণহত্যা নয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চালিয়েছে, তা আজ বিশ্বময় স্বীকৃত। বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা, এমনকি জাতিসংঘও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যা সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে তথ্য-প্রমাণসহ বক্তব্য দিয়ে আসছে।

আবার এটাও এক সাধারণ যুক্তির কথা যে, মিয়ানমার থেকে ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বিনা কারণে পালিয়ে বাংলাদেশে আসেনি। ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের প্রেক্ষাপটেই তারা পালিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচাতে চেয়েছেন।

অথচ সু চি নির্বিকারভাবে আদালতে দাঁড়িয়ে এসব সত্য অস্বীকার করেছেন। তার এই মিথ্যাচার প্রকৃতপক্ষে বিশ্বমানবতার জন্য এক বড় দুঃসংবাদ, একইসঙ্গে মানবেতিহাসে এ এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।

বিশ্ববাসী আশা করেছিল, অং সান সু চি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কক্ষচ্যুত হয়ে শান্তিতে প্রকৃতই একজন নোবেলজয়ী হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে সত্যকে আশ্রয় করবেন। কিন্তু না, দেখা গেল তিনি বরাবরের মতো তার দেশের সেনাশাসনেরই মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।

শুধু তাই নয়, তিনি তার বক্তব্যে এমনসব কথা উচ্চারণ করেছেন যা একজন শিক্ষিত নারীর পক্ষে মানায় না। আমাদের এখন ভাবতে কষ্ট হয়, গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় এই নারীর মুক্তির পক্ষে স্লোগান দিয়েছিলাম আমরা।

কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে তার দেশের স্টেট কাউন্সেলরের পদটি অলংকৃত করে সু চি এমন মূর্তিতে আবির্ভূত হবেন, তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। বস্তুত তার চরিত্রে গণতন্ত্র, মানবিকতা ইত্যাদির ছিটেফোঁটাও নেই, যা আছে তা হল স্বৈরতন্ত্র, নির্মমতা।

আদালতে সু চির বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে সারা বিশ্বে। হতেই হবে। কারণ সু চি দাঁড়িয়েছেন বিশ্ব মানবতার বিপক্ষে। তার নিজের দেশেরই এক স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ মং জারনি বলেছেন, ঘটনা অস্বীকার করে সু চি এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছেন।

টেলিভিশনে সু চির বক্তব্য প্রচারের পরপরই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের রোহিঙ্গারা তাকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। ওদিকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ যাবতীয় অপরাধের স্বীকৃতি দিতে সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আট ব্যক্তিত্ব।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে সু চি বলেছেন, রাখাইন প্রদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রতি মিয়ানমার অঙ্গীকারাবদ্ধ। তার এই বক্তব্যের প্রতি আস্থা রাখা কঠিন। কারণ গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে যে ছলনার আশ্রয় নিয়েছে, তার সঙ্গে সু চির এই বক্তব্যের কোনো মিল নেই।

তাছাড়া রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সু চির মনোভাব যে কী, তা আদালতে তার পুরো বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। তারপরও আমরা বলব, আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের রায় যা-ই হোক, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রশ্নে সু চির বক্তব্যের প্রতিফলন দেখতে চাই আমরা।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত