মুক্তিযুদ্ধে বাবা হারানোর স্মৃতি

  কাজী ছাইদুল হালিম ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ

স্কুলের গণ্ডিতে পা পড়েনি তখনও। বাড়ি থেকে গোটা হাইস্কুল মাঠটা দেখা যায়। প্রতিদিন সকালে সেখানে ট্রেনিং হয়। লেফট রাইট, লেফট রাইট, আরামে দাঁড়াও, সোজা হও কথাগুলো বেশ পরিষ্কারভাবে শোনা যায়। কৌতূহলবশত কয়েকবার আমি পাশের রাস্তায় গিয়ে ট্রেনিং দেখি। ট্রেনিংয়ে অনেকে অংশগ্রহণ করে। আমার বাবা তার ছাত্রদের ট্রেনিংয়ে নিয়ে যান।

হঠাৎ এক বিকালে দেখি মা কাপড়চোপড় বাক্সে ভরছেন। যতটা মনে পড়ে, পরদিন সকালে আমার মামা আফজাল মিল্লাত আমাদের বাড়ি নজিপুর এলেন। আমাদের পশ্চিম দিকের মাটির ঘরে মামা ও বাবা একটা বন্দুক নিয়ে সম্ভবত সেটা কিভাবে পরিচালনা করতে হবে সে বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। জিদ ধরে বিকালে মামার সঙ্গে নানা বাড়ি রাঙ্গামাটি গেলাম।

নানা বাড়ি থেকে সম্ভবত দু’দিন পর আমাকে কে যেন আমাদের বাড়ি নজিপুরে দিয়ে গেল। বাড়িতে এসে দেখি একটা অপরিচিত পরিবার নওগাঁ শহর থেকে এসেছে। বাবা, মা এবং ছোট দুই ভাইয়ের কেউই সেখানে নেই। আমার সে কী ভয়, কান্না! আমাদের গ্রাম এ দুই দিনে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে।

খুঁজে পেলাম চাচাতো ভাই নজরুলকে। কান্না ধরলাম তার কাছে আমাকে মা’র কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার কান্না সহ্য করতে না পেরে তিনি আমাকে বললেন, তোর আম্মা শ্রীপুর (নজিপুর থেকে পাঁচ মাইল উত্তর পশ্চিমে) আছে, চল তোকে রেখে আসি। আমি মা এবং ছোট দুই ভাইকে পেয়ে কী যে খুশি!

বলছি ১৯৭১ সালের কথা, সময়টা সম্ভবত এপ্রিলের মাঝামাঝি, পরে জেনেছি। শুনেছি যেদিন আমি নজিপুর থেকে শ্রীপুরে আসি তার দুই বা তিন দিন পর পাকবাহিনী নজিপুর আক্রমণ করে কয়েকশ’ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। নজরুল ভাই সেদিন আমাকে নজিপুর থেকে শ্রীপুরে না দিয়ে এলে আমাকেও হয়তো পাকবাহিনীর হাতে জীবন দিতে হতো অথবা আমি হারিয়েও যেতে পারতাম।

মামার সঙ্গে রাঙ্গামাটি যাওয়ার পর থেকে আর বাবার সঙ্গে দেখা নেই। সবসময় বাবাকে খুঁজে ফিরছি। সবাই বলছে, আমার বাবা যুদ্ধে চলে গেছেন। নজরুল ভাই যেদিন আমাকে শ্রীপুর দিয়ে গেলেন, তার দুই বা তিন দিন পর হঠাৎ এক বিকালে কোথা থেকে যেন আমার বাবা দৌড়ে শ্রীপুর এসে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।

অনেকে তার মাথায় পানি দিতে লাগল। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন বলছিলেন, নজিপুরে পাকবাহিনী এসেছে। বাবা জ্ঞান ফিরে পাওয়ার কিছু পরে আবার কোথায় যেন চলে গেলেন।

এরপর আমরা গরুর গাড়িতে করে ভারতের ভেতর তপন থানার সিরাহাল নামক গ্রামে এক আত্মীয়র বাসায় এলাম। সিরাহাল কয়েকদিন থেকে আমরা তপন থানার নারাই নামক গ্রামে আসি। এখানে আমরা বেশ কিছুদিন আরেক আত্মীয়র বাসায় থাকি।

বাবাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছা করত! তিনি একদিন কয়েকজনকে নিয়ে একটা জিপ গাড়িতে করে নারাই গ্রামে এলেন। তাদের একজন ছিলেন সোলাইমান (আমাদের এলাকার এক মুক্তিযোদ্ধা) চাচা। কিছু সময় থেকে সবাই আবার চলে গেলেন।

নারাই গ্রাম থেকে একসময় আমরা বালুরঘাটের তপন থানার দাঁড়াইল হাটে আসি। এটি আমার বাবার জন্মস্থান, আমার দাদাবাড়ি। ভারত যখন বিভক্ত হয় তখন আমার বাবার পরিবার নজিপুরে চলে আসেন। যা হোক, দাঁড়াইল হাটে আমরা কিছুদিন এক চাচার বাসায় থাকার পর ধনিমুল্লা নামক এক ব্যক্তির বাসায় থাকি।

দীর্ঘদিন দাঁড়াইল হাটে থাকাবস্থায় বাবাকে পেয়েছি মাত্র কয়েকদিন। অনেকদিন পর সম্ভবত নভেম্বরের শেষদিকে একরাতে বাবা চলে এলেন দাঁড়াইল হাটে। মা’র সঙ্গে গল্প করছিলেন, যুদ্ধ শেষের পথে, আর যেতে হবে না। দু’দিন পর বাবার কয়েকজন ছাত্র, তারাও মুক্তিযোদ্ধা, বাবাকে ডাকতে এলেন, বালুরঘাট যেতে হবে।

মা বাবাকে বালুরঘাটে যেতে দিতে চাননি। বাবার ঘড়ি, জামা ও ব্যাগ লুকিয়েও রেখেছিলেন, কিন্তু আটকাতে পারেননি। বাবা হয়তো চেয়েছিলেন যতদিন প্রয়োজন লড়ে যাবেন দেশের জন্য। তিনি ফিরে এলেন দাঁড়াইল হাটে; কিন্তু চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে। তারিখটা ছিল সম্ভবত ৯ ডিসেম্বর। বাবার শরীর ছিল গ্রেনেডের টুকরায় ঝাঁঝরা। আমার মা হারালেন তার স্বামীকে, আমরা হারালাম আমাদের বাবাকে।

কাজী ছাইদুল হালিম : শহীদ কাজী আবদুল জব্বারের বড় ছেলে

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×