শরণার্থী সংকট ও মানবতা

  লাভা মাহমুদা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধ

একাত্তরে অনেক রক্ত আর কষ্টের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রঞ্জিত হয় বাংলার সবুজ জমিন, আমরা পাই প্রাণের মানচিত্র। পাকবাহিনীর নির্মমতায় কেঁপে ওঠে প্রায় প্রতিটি অঞ্চল। আর যুদ্ধাঞ্চলের প্রাসঙ্গিকতায় স্বাভাবিক সংকট হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই সৃষ্টি হয় শরণার্থী সমস্যা। এ পরিস্থিতিতে পূর্ববঙ্গের মানুষ বাধ্য হয় দেশত্যাগে।

২৫ মার্চের মধ্যরাতে বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু হলে প্রাণভয়ে ও নিরাপত্তার সন্ধানে লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন পথে পাশের দেশ ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে আশ্রয় নেয়। শরণার্থীদের বেশির ভাগ আশ্রয় নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, বাকিরা ত্রিপুরা ও আসামে। ’৭১-এর ১৫ ডিসেম্বর শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫-এ। অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে, ত্রিপুরায় আশ্রয় নেয়া শরণার্থীর সংখ্যা ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যার সমান হয়ে যায়। সেসময় জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার প্রধান প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান শরণার্থী সমস্যাকে জাতিসংঘের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। জাতিসংঘ বাংলাদেশ সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে তেমন কিছু করতে না পারলেও শরণার্থী সমস্যায় সবচেয়ে বড় মানবিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। বস্তুত, শরণার্থী ইস্যুর ব্যাপকতাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে সহানুভূতির জন্ম দিয়েছিল।

শরণার্থীর কারণেই মারাত্মক সংকটে পড়ে ভারতও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। ভারতের সরকার ও জনগণও বন্ধুর মতো বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সারা বিশ্বে জোরালো প্রচারণা চালান। শরণার্থীর জন্য ভারতীয় অর্থনীতি প্রবল চাপে, এই যুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হন। ফলে ডিসেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত বাহিনী ঢাকার দিকে অগ্রসর হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা হৈচৈ হয়নি। বরং বাঙালিদের ন্যায়সঙ্গত স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত সমাধান হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বস্তি ফেরে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, পৃথিবীর কোনো দেশই শরণার্থীদের ভালো চোখে দেখে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো দেশগুলো সক্ষমতার বাইরে শরণার্থী গ্রহণ করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উদ্বাস্তুদের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিবেশ, প্রতিবেশ, জল, আবহাওয়া সবকিছুই বিপন্ন হতে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় স্থানীয় জনগণ সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। উদ্বাস্তুরাও তাদের ভূখণ্ড, পরিচয়, নিজস্বতা হারিয়ে অনেকটা আগ্রাসী হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিকালে রোহিঙ্গাদের আচরণেও এমনটাই প্রকাশ পায়। নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অবস্থানে যখন অন্য ভূখণ্ডের বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান নেয়, সঙ্গত কারণেই স্থানীয়দের তা স্বাভাবিকভাবে নেয়ার কথা নয়। মিয়ানমারের তৈরি করা সংকটে কক্সবাজার তথা সারা বাংলাদেশ এমনই সংকটে পড়েছে।

তবে নির্মম সত্য হল, বর্তমান বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ শরণার্থী সংকটে ভুগছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে রাজনৈতিক, সামরিক, জাতিগত ও মতাদর্শগত নানা সংকট মানুষের কাছে থেকে কেড়ে নিচ্ছে জাতি, পরিচয়, বেঁচে থাকার অধিকার, মানবিক মর্যাদা। এ সংকটে ইতিমধ্যে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছে। ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছে। প্রায় ১ কোটি মানুষের কোনো পরিচয় নেই। সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ভেনিজুয়েলা, মিয়ানমার, সোমালিয়ার অসংখ্য নাগরিক ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ভারতেও এনআরসির নামে লাখ লাখ মানুষ অনিশ্চয়তার কবলে পড়তে যাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে নানা মেরুকরণ চলছে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতায়। এ পরিস্থিতিতে যে কোনো জনগোষ্ঠীই তার জাতি-পরিচয়-নিজস্বতা হারাতে পারে। পৃথিবীর সব মানবতাবাদী শান্তিকামী মানুষকে সোচ্চার হতে হবে, আওয়াজ তুলতে হবে এখনই। নতুবা ভূখণ্ড-পরিচয়-নিজস্বতা হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে পারি আমি, আপনি বা অন্য যে কেউ।

লাভা মাহমুদা : শিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×