এক শহীদ মাতার দিনলিপি

  ডা. এম এ হাসান ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরাধীন ভারতে স্বদেশী আন্দোলন ও বিপ্লবী যুগে প্রগতিশীল এক পরিবারে বেড়ে ওঠা নারী সালেমা বেগম। ডাকনাম রানী। ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর কুয়াশাচ্ছন্ন প্রত্যুষে জন্ম হয় তার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সন্তান হারিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা গুড়িয়ে দেয় শহীদ মিনার, ইকবাল হল, ঢাকা হল এবং জগন্নাথ হলের ছাত্র ও শিক্ষকদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। যারা জীবিত ছিল, তাদেরকে বাঙ্কারের ভেতরে ফেলে তাদের উপরে মাটি চাপা দিয়ে জীবিত কবর দেয়া হয়। এসব কথা শুনে আমার দু’সন্তান সেলিম ও হাসানকে যুদ্ধে পাঠালাম। যুদ্ধে পাঠানোর সময় বললাম, যাচ্ছ বীরের মতো, আসবে বীরের মতো; পিঠে গুলি নিয়ে ফিরবে না- এ আমার বিশ্বাস ও দোয়া।

‘এর মধ্যে সারা বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। শুরু হল প্রতীক্ষা। কবে ফিরে আসবে আমার বুকের ধনরা, আমার সোনা মানিকরা। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। দিনগুলি কত বড়, শেষ হয়েও শেষ হয় না। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর আশঙ্কায় দরুদ ও আয়তালকুরসি পড়ি। আস্তে আস্তে যুদ্ধ শেষের দিকে এল। ১৬ ডিসেম্বর ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা লাল পথ ধরে বহু কাঙ্ক্ষিত বিজয় দিবস এল। ঢাকার বুকে বাংলাদেশের পতাকা পত পত করে উড়ছে, চোখ জুড়িয়ে গেল। আমার ছেলেরা কোথায়? আমার ছেলেরা কি জীবিত আছে, দেখা কি হবে?

‘১৭ ডিসেম্বর সকালে তেজগাঁর দিকে হেঁটে হেঁটে রওনা দিলাম। মন বলছে, ছেলেরা আমার বেঁচে থাকলে অবশ্যই একবার আমার খোঁজে তেজগাঁর বাসায় যাবেই। তাই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে হেঁটে হেঁটে ফার্মগেট পর্যন্ত গেছি। এমন সময় আমার এক আত্মীয় অনেক দূর থেকে চিৎকার করে বলছে, বড় আপা তোমার ছেলেরা ফিরে এসেছে। ওরা বাংলাদেশের আর্মি অফিসার। তুমি আমার বাসায় যাও, সেলিম তোমার সঙ্গে ওখানে দেখা করতে যাবে। আমি আনন্দে অধীর হয়ে জোর কদমে আত্মীয়ের সেই বাসায় নিস্পলক চোখে উদগ্রীব হয়ে ওর অপেক্ষাতে থাকলাম। অবশেষে সেই পরমক্ষণটি এল, যার জন্য দীর্ঘ নয়টি মাস গভীর আগ্রহে দিন গুনেছি। সেলিম একটানা বারান্দার উপর দিয়ে বীর পদক্ষেপে হেঁটে আসছে। আমি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। সেলিম দ্রুত এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, মা আমি ফিরে এসেছি। আনন্দের অশ্র“তে ওর বড় বড় চোখ দুটি ভরে গেল। আজ আমি কত খুশি, দীর্ঘ ন’মাস পর আমার নিখোঁজ ছেলেদের ফিরে পেয়েছি। আমি আনন্দে উচ্ছ্বাসে ভরপুর হয়ে গেলাম। আমার এই সুখ ও আনন্দ দেখে বিধাতা বুঝি অলক্ষে হেসেছিল।

‘১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি আমার জন্য পৃথিবীর বিভীষিকাময় দিন। সকালটা মনে হয় সুন্দর ছিল। কে জানত দিনটা এমন কারবালার প্রান্তর হবে। সকাল ১১টা পর্যন্ত সাদামাটা দিনের মতো শুরু হলেও তারপর কী হল মিরপুরের ওই বধ্যভূমিতে? কেন তা ২৮ বছর চাপা পড়ে ছিল কালো আবরণে? কেন আমাদের স্বজনহারাদের অন্ধকারে রেখে বীরের ইতিহাস, ত্যাগের ইতিহাস আড়াল করা হয়েছে! সেদিন ৩০ জানুয়ারি কী ঘটেছিল মিরপুর ১২ নম্বরে? কার কাছে এর উত্তর পাব? কেন আমার সন্তান এক অসম অঘোষিত যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল? তখনকার সেনাবাহিনী প্রধানের কাছে প্রত্যেক স্বজনহারার মতোই আমার প্রশ্ন- কেন এতদিন চাপা দেয়া ছিল শহীদদের অস্থিকরোটি? সেলিম ও সুবেদার মোমেনসহ ৪১ সেনাসদস্য ও পুলিশ বাহিনীর যারা আত্মদান করল, তাদেরকে কীভাবে জাতি সম্মানিত করেছে তা জানার অধিকার সমগ্র জাতির।’ (সংক্ষেপিত)

ডা. এম এ হাসান : চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, বাংলাদেশ

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত