নিরাপত্তা যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম ১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অদৃশ্য এক অণুজীবের ভয়াল আক্রমণে মানুষ নিজ নিজ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছে। অজানা এক আতঙ্ক ও মৃত্যুভয় গোটা মানবজাতিকে আড়ষ্ট করে তুলেছে। কারণ মৃত্যুভয়ের চেয়ে বড় ভয় আর নেই।

এ ভয় ঠেকাতে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে যারা রয়েছেন তারা হলেন- চিকিৎসক, নার্স তথা সব স্বাস্থ্যকর্মী। পাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে আছেন পুলিশ, সেনাবাহিনী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও অন্যরা।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা নিজেরাই কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রথমদিকে করোনা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামাদি না থাকায় চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে আত্ম সুরক্ষার কথা ততটা চিন্তা না করে মানুষকে বাঁচানোর জন্য দায়িত্ব পালন করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

পুলিশ বাহিনী সরকারি আদেশ পালন করতে কালবিলম্ব না করে যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা ব্যতিরেকেই মানুষকে সেবা দিতে তৎপরতা শুরু করে।

সমস্যা হল- করোনা আক্রান্তদের জন্য সেবা অন্য যে কোনো নির্ভয় সেবাদানের মতো সহজ কাজ নয়। এ ভয়ংকর রোগটির বিষয়ে কারোই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। চীনের চিকিৎসকদের আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার খবরগুলো ফলাও করে প্রচার করা হলেও আমাদের দেশে সেগুলোকে ততটা বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

যেমন গুরুত্বহীন মনে করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ। ফলে ওদের মতো আমরাও চিকিৎসক, পুলিশদের মূল্যবান প্রাণ হারাতে শুরু করেছি।

প্রথমদিকে ভেজাল মাস্ক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার উদ্বেগজনক সংবাদ আমরা পেলেও এখন এ সমস্যা কিছুটা কমেছে। তবে বেড়েই চলেছে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের করোনায় আক্রান্ত হয়ে কোয়ারেন্টিনে চলে যাওয়ার সংখ্যা।

ফলে ভয়াবহ চিকিৎসক সংকট মোকাবেলায় নতুন দু’হাজার চিকিৎসককে নিয়োগ দান করা হলেও তাদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বেশ কঠিন মনে হচ্ছে। কারণ প্রতিদিন হু হু করে বেড়ে যাওয়া রোগী এবং তাদের চিকিৎসাসেবার সরঞ্জাম ও জায়গা সংকুলানের বিষয়টি এখনও মোটেও আশাপ্রদ ও নিরাপদ নয়।

বিভিন্নভাবে কিছু নতুন সংকুলানের আয়োজন করা হলেও সেগুলোতে মাস্ক, কিটস, অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর ইত্যাদির ব্যবস্থা অপ্রতুল।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার আগেই দায়িত্ব পালন করতে দিলে সেটা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেশের জন্য আত্মঘাতী হবে। তাই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসা যোদ্ধাদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে এর সমাধান করতে হবে।

এদিকে পুলিশের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখা থেকে সম্প্রতি কেন বেশিসংখ্যক পলিশ সদস্য করোনায় সংক্রমিত হয়ে পড়েছেন তার কারণগুলো জানানো হয়েছে। পুলিশিং একটি ইউনিক প্রফেশন। এ জন্য তাদের সবসময় মানুষের কাছে যেতে হয়, মিশতে হয়। বিভিন্ন অপরাধীর পেছনে দৌড়াতে হয়, হাতকড়া পরাতে হয়, স্পর্শ করতে হয়।

এ ছাড়া পুলিশকে জনসমাগমে যেতে হয়, দলবদ্ধ হয়ে কাজে নামতে হয়। পেশাদারি সমাজকর্মের ভাষায় যেটাকে ‘গ্রুপ সোশ্যাল ওয়ার্ক’ বলা হয়ে থাকে। প্রতিনিয়ত পাবলিক অর্ডার ম্যানেজ করতে পুলিশকে রাত-দিন অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। কাউকে কাউকে পোশাক ও একই বুট বারবার পরে বের হতে হয়- পাল্টানোর ফুরসত থাকে না।

মাঠ পর্যায়ে অপারেশনে যেতে পুলিশকে বড় ভ্যানে একত্রে পাশাপাশি, মুখোমুখি বসতে হয়। ব্যারাকে ফিরে এক কক্ষে অনেকজন সদস্যকে গাদাগাদি করে ঘুমাতে হয়, কমন টয়লেট শেয়ার করতে হয়। করোনার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যক্তি-সামাজিক বা পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা খুব কঠিন কাজ। এ জন্য তাদের করোনা ঝুঁকি বেশি, সংক্রমণের হার বেশি।

এখন কথা হল- ডাক্তার, পুলিশ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে সেবাদান করতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হয়ে নিঃশেষ হতে থাকলে এরপর হাজার হাজার করোনা রোগীর সেবাদান করবে কে? এটা গা শিউরে ওঠার মতো প্রশ্ন। তাই অচিরেই করোনা সেবায় নিয়োজিত সব ধরনের নিরাপত্তা যোদ্ধাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

ডুবুরিকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে যেমন নিজেকে সাঁতার জানতে হয়, লাইফ জ্যাকেট পরতে হয়, অক্সিজেন মাস্ক মুখে নিতে হয়; তেমনি পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ এবং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার বিধির ট্রেনিং দিয়ে মাঠে যেতে হবে।

কারণ অচিরেই ধেয়ে আসছে আরও বড় বিপর্যয়। অতীতের মহামারীগুলোতে পৃথিবীর সব দেশ এভাবে একসঙ্গে আক্রান্ত হয়ে পড়েনি। তখন একজনের বিপদে অন্যজন, এক দেশের বিপদে অন্য দেশ দ্রুত হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই শঙ্কা বেশি। কেউ কারও দায়িত্ব নিতে সাহস পাচ্ছে না।

তাই প্রবাসীরা বিদেশি কর্মস্থল ছেড়ে চার্টার্ড বিমান ভাড়া করে হলেও নিজ নিজ দেশে দ্রুত আসছে ও চলে যাচ্ছে। মানুষ হন্যে হয়ে নিজ নিজ দেশে, নিজ ঘরে ঢোকার জন্য উদগ্রীব হয়েছে।

করোনাতঙ্কের কঠিন সময়ে এরূপ অশনিসংকেতের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক মন্দা বা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিপর্যয়ের ঢেউ সামলানো খুব কঠিন। এ জন্য মানুষের আগামী জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস লক্ষ করা যাচ্ছে।

সেই আগামীর জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে মানুষকে আগে টিকে থাকতে হবে। এ জন্য চাই যথেষ্ট সচেতনতা এবং যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

আবার কলকারখানা, গণপরিবহন চালু, দোকানপাট খোলা ও ব্যাপক জনসমাগম তৈরির দিকে যাওয়ার আগেও যথেষ্ট নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা অবহেলা করে ব্যাপক কমিউনিটি সংক্রমণের মতো ঘটনা ঘটার পর মার্কিনিদের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হতে চাই না।

করোনা সংক্রমণের প্রক্রিয়া এখনও অনেকটা অজানা। করোনা নিরাময়ের ওপর কারোরই শতভাগ অভিজ্ঞতা নেই। তাই এ ক্ষেত্রে নিজের সতর্কতা ও সচেতনতাকেই নিজের নিরাপত্তা মনে করতে হবে। এভাবে একদিকে নৈতিকতা এবং অন্যদিকে মানুষে মানুষে পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসার নতুন ধারায় উদ্ভাসিত হয়ে একটি নতুন পৃথিবী জন্ম নিক- সেই আশায়।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত