করোনাকালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান

  এম আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী ২১ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা দুর্যোগের এ সময়ে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। করোনা মোকাবেলার নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি উপকূলের অধিকাংশ মানুষই জানে না। আবার কেউ কেউ পালন করতেও চায় না।

ফলে করোনাকালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় অধিকতর সুরক্ষার বিষয়ে নজর দিতে হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুর্যোগের প্রতিনিয়ত আঘাতে উপকূলের কোটি কোটি মানুষের জীবন, সম্পদ, মর্যাদা তথা বেঁচে থাকার অধিকারটুকু বিপন্ন হয়ে পড়ে।

বারবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত দেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯ বার। এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পরপর।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৪৯ বছরে ১৫৪টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা ঘটেছে ঘন ঘন। সিডর, আইলা, রিজভি, লাইলা, মোরা, তিতলি, ফণী, নার্গিস, বুলবুলের আঘাতে সুন্দরবন পর্যুদস্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার হয় সব সময়।

তথ্যমতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার, নদীর মোহনা ও ছোট-বড় দ্বীপমালা ২৭৫ কিলোমিটার, সমতল ও সমুদ্রসৈকত ৩১০ কিলোমিটার।

টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে বিস্তৃত উপকূলেই দেশের প্রধান তিনটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর (কাজ চলমান)।

দেশের ২৫ শতাংশ মানুষ যেমন এই উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির কমবেশি প্রায় ২৫ শতাংশ অবদানও এ অঞ্চলের। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকা উপকূল। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে গড়ে ৭৪৩ জন।

দেশে বর্ধিত খাদ্যশস্য উৎপাদন নিঃসন্দেহে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি বা সাফল্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিতে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির অবদান তুলনামূলক নিুমুখী। এ অঞ্চলের কৃষি খাত প্রধানত শস্য ও অশস্য (নন ক্রপ) দুই ভাগে বিভক্ত।

প্রথমত, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত হওয়ার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক বৃদ্ধি পায়নি। উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে যাওয়া এবং পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও চাষাবাদ পদ্ধতি-প্রক্রিয়ায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল ততটা আসেনি, যতটা অশস্য অর্থকরী খাতে অর্থাৎ মৎস্য চাষসহ প্রাণিসম্পদ চাষ ও বিকল্প পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এসেছে।

অশস্য খাতে আপাত ব্যাপক সাফল্যের ফলে কৃষিক্ষেত্রে গড়পড়তায় জিডিপিতে এখনও সমানুপাতিক হারে অবদান (২৫ থেকে ২৩ শতাংশ) রেখে চলেছে এ অঞ্চল। অশস্য খাতের এ সাফল্যকে টেকসই করা যেমন প্রয়োজন, একই সঙ্গে শস্য উৎপাদন, জমির সঠিক ব্যবহার, উপায়-উপাদান সরবরাহ, চাষ পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তির সমাবেশ, এমনকি ভূমি প্রশাসনেরও সংস্কার আবশ্যক।

মোদ্দা কথা, সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, তার গতি-প্রকৃতির বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। উষ্ণায়নের প্রভাবক ক্ষয়ক্ষতিকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে সম্ভাবনাময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের অবদান থেকে অদূরভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতি শুধু বঞ্চিতই হবে না; সময়ের পরিক্রমায় জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটি গোটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য দুর্ভাবনার কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে।

দেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গ সুন্দরবন, পর্যটন সম্ভাবনাময় কক্সবাজার ও কুয়াকাটাকে কার্যকর অবস্থায় পাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য যে কত জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিডর ও আইলার প্রভাবে সুন্দরবন ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণিসম্পদের ওপর যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়, তাতে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ দেখা দিয়েছে।

উপকূলে এমন কিছু বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল রয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ বা সৌরবিদ্যুৎ নেই। এ রকম প্রান্তিক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা চরগুলোর মানুষের কল্যাণে বিদ্যুতের ব্যবস্থা জরুরি। নদ-নদীর ভাঙন উপকূলীয় জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নদ-নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ শাসন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে পারলে উপকূলীয় অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রখতে সক্ষম হতো।

উপকূলীয় নদ-নদীর ভাঙনপ্রবণ অঞ্চল চিহ্নিত করে বাঁধ নির্মাণ এবং পুরনো বাঁধ সংস্কার জরুরি। ক্ষেত্রবিশেষ ৬ থেকে সর্বোচ্চ ১০ মিটার বাঁধ উঁচু করতে হবে। উপকূলীয় বাঁধগুলো টেকসই এবং নির্মাণকাজ যথাযথ তদারক করলে আগামী ১০০ বছরেও এ বাঁধের কোনো ক্ষতি হবে না। টেকসই বাঁধ নির্মিত হলে উপকূল ও উপকূলের চরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকার গতি বাড়বে।

তিন মাস ধরে করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে আসছে দেশের মানুষ। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্পান মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও করোনাকালীন আম্পানের ক্ষতি মোকাবেলার বিষয়টিকে আমাদের ভিন্নভাবেই দেখতে হবে। করোনা এবং আম্পান জয় করে এগিয়ে যাক আমাদের প্রিয় দেশ।

এম আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ঘূর্ণিঝড় আম্পান

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত