এমন বিষণ্ন ঈদ আসেনি আগে

  আল ফাতাহ মামুন ২৩ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। কিন্তু এবার ঈদে নেই খুশি। এই প্রথম পৃথিবীজুড়ে এমন বিষণ্ন ঈদের সাক্ষী হচ্ছি আমরা। ঈদ ঘিরে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, আনন্দ নেই। কেনাকাটার ধুমধাম তো প্রশ্নই ওঠে না। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য করোনার ধাক্কা সামলানো সত্যিই খুব কঠিন ব্যাপার। বিশেষ করে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল নয়। ফলে করোনার কারণে যখন লকডাউনের কবলে পড়ে সব ধরনের উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে, তখন থেকেই মানুষের কষ্টের দিন শুরু হয়েছে। যারা মধ্যবিত্ত কিংবা মাঝারি ব্যবসায়ী তারা প্রথম এক-দেড় মাস হয়তো টেনেটুনে সংসার চালিয়েছেন; কিন্তু এখন আর চলছে না। এই যদি হয় মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের অবস্থা, তাহলে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্রশ্রেণির অবস্থা কী হতে পারে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, উৎসব কখনও একাকী হয় না। উৎসব করতে হয় দশজনে মিলে। বছরের বাকি সময় আমরা একাকী থাকি, নিজেকে নিয়ে ভাবি। উৎসবের দিন আমরা দশজনের সঙ্গে মিশি। অন্যদিন আমরা নিজের খাওয়াটা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি। উৎসবের দিন আর দশজনকে খাওয়াতে পারলে আমরা সুখ অনুভব করি। অথচ এ বছরের ঈদের দিনও আমাদের নিজের খাওয়া নিয়েই ভাবতে হবে। পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ভাবার সামর্থ্য অনেকেরই নেই। এমন শ্রীহীন ঈদ, এমন বিষণ্ন ঈদ পৃথিবীর বুকে আর কখনও এসেছিল বলে আমাদের জানা নেই। পরম করুণাময়ের কাছে জোর প্রার্থনা- পৃথিবীর বুকে যেন এমন ঈদ আর কখনও না আসে।

আমাদের দেশের মানুষের ধৈর্য কম, তার ওপর সচেতনতার অভাব। এ দুটোর চেয়ে মারাত্মক রোগ হল আমরা অতি আবেগী ধার্মিক। আমার পরিচিত একজন করোনা রোগের উপসর্গ নিয়ে মসজিদে আসা-যাওয়া করেন। আমি বললাম, এ মুহূর্তে আপনার বাসায় নামাজ পড়া দরকার। তিনি বললেন, মরলে মসজিদে গিয়েই মরব। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মসজিদে যাবেন কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য। আমি বললাম, আল্লাহ তো বলেছেন তুমি সতর্ক থাকো, সচেতন থাকো। যেন নিজেও বাঁচতে পারো, অন্যকেও বাঁচাতে পারো। কে শোনে কার কথা। তিনি মসজিদে যাওয়া বন্ধ করেননি। এখন ওই এলাকার বেশিরভাগ মানুষেরই করোনার উপসর্গ দেখা গেছে।

ঈদের নামাজে মুসল্লিদের ঢল নামতে পারে। শহরের মসজিদগুলো হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু মফস্বলের বেশিরভাগ মসজিদেই স্বাস্থ্য নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। অথচ সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি ইতোমধ্যে ফতোয়া দিয়েছেন, ঈদের নামাজ ঘরেও আদায় করা যায়। নারী-পুরুষ সবাই মিলে জামাতে অথবা একা একা ঘরে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেবেন। এবারের ঈদে আমরা হয়তো ময়দানে যেতে পারব না, মসজিদে যাওয়াটাও ঝুঁকিমুক্ত নয়, তাই ঘরই হবে আমাদের ঈদের ময়দান। এটা আমাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ যে, শুধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই আমরা এবার ঈদ করতে পারব। এক্ষেত্রে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা-সম্প্রীতি বাড়ানোর জন্য এবারের ঈদকে আমরা কাজে লাগাতে পারি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কেন জানি আমরা ঘরের লোকের চেয়ে বাইরের লোককেই বেশি ভালোবাসা-সম্প্রীতি দেখাই। সন্তানদের সঙ্গে মিষ্টি কথা বলতে ভুলে গেছে এমন বাবা-মা ঘরে ঘরেই পাওয়া যাবে। অন্যান্য বছর ঈদে আমরা বন্ধুদের সঙ্গে মজা করি, আনন্দ করি, হাসি-গাই; এ বছর আমরা ঘরের আপনজনদের সঙ্গেই যদি সম্প্রীতিপূর্ণ ঈদ উদযাপন করতে পারি, তাহলে এবারের ঈদই হবে আমাদের জীবনের সেরা ঈদ। এবারের ঈদে আমরা জমজমাট শপিং করতে পারিনি, ঈদের দিন ভালো-মন্দ খাবার সবার প্লেটে হয়তো জুটবেও না; কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা মা-বাবা, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করব। করোনার দিনে বিষণ্ন ঈদে আমরা সুন্দর আচরণ দিয়ে সবার মন ভরিয়ে দেব। এতে আমাদের হৃদয়ের প্রশান্তি অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

এরপরও যারা মাঠে বা মসজিদে নামাজ পড়তে যাবেন, অবশ্যই তারা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন। যদিও এ মুহূর্তে ঈদের নামাজের চেয়ে জীবন বাঁচানোটাই বড় ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোলাকুলি, মুসাফা এগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন। অহেতুক বাইরে ঘোরাঘুরি, আড্ডাবাজি করবেন না। আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে না যাওয়াটাই হবে এবারের ঈদে বুদ্ধিমানের কাজ। কেউ হয়তো বলবেন, এভাবে তো আমরা অসামাজিক হয়ে পড়ব। দুর্যোগ কেটে গেলে আমরা অনেক সামাজিক হতে পারব; কিন্তু এখন সামাজিকতার চর্চা করতে গিয়ে সমাজকে অসুস্থ করা অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সবকিছু ঠিক হতে হয়তো বছরখানেক লেগে যাবে। এ অবস্থায় আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। করোনা বা আম্পান যাই বলি না কেন, এগুলো এসেছে আমাদের আরও শক্তিশালী করতে। এখন সময় এসেছে ধৈর্য্যরে পরীক্ষা দেয়ার। এ পরীক্ষায় আমরা ভরসা করব আল্লাহর ওপর। সামর্থ্যমতো অন্যের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব। ইনশাল্লাহ করোনার কালো মেঘ অবশ্যই কেটে যাবে। দুর্যোগে ভেঙে না পড়া জাতি হিসেবে আবার পৃথিবীর বুকে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াব।

আল ফাতাহ মামুন : প্রাবন্ধিক

[email protected]

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত