ভিয়েতনাম যে কারণে উদাহরণ

  বিমল সরকার ২৯ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়’। উদ্ধৃতিটির সঙ্গে বোধকরি কমবেশি সবাই পরিচিত। সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়, অসময়ে বা সময় হারিয়ে করলে কেবল জঞ্জালই বাড়ে। কেবলই কি জঞ্জাল? কখনও কখনও এমনকি জীবনও বিপন্ন হতে পারে।

ফোঁড় মানে সুইয়ের ঘাই। জামার সামান্য একটা ফুটো, সুই দিয়ে একটি ঘাই দিলেই রিপেয়ার করা যায়। কাজ চলে, চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু তা না করে অবহেলা করলে সামান্য ফুটোটিই দিনে দিনে বড় হবে এবং পরে তা রিপেয়ার করতে সুতো লাগানো সুইটি দিয়ে অন্তত ৯টি ঘাই দিতে হবে। তাও পরিস্থিতি সমর্থন দিলে। অবহেলা করতে করতে এমন জামাকে রিপেয়ারের অযোগ্য বলে একটি সময় ফেলেও দিতে হয়, দেয়া লাগে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারীর এই দুর্দিনে বেশ ক’দিন ধরেই বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে একটি সুর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- ভিয়েতনাম, কিউবা, চীন, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান কীভাবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করল?

ভিয়েতনামের কথাই ধরা যাক। প্রায় ১০ কোটি জনঅধ্যুষিত একটি দেশ, করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের সীমান্তবর্তী যার অবস্থান, ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে সেখানে শনাক্ত হয় করোনা রোগী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩২৭ ব্যক্তি আক্রান্ত হলেও সময়োচিত পদক্ষেপ নেয়ায় দেশটিতে একজন লোকও মারা যায়নি। আর আক্রান্তের সংখ্যাও অবিশ্বাস্য রকমের কম। এমনকি ৮৮ বছরের ভিয়েতনামি বৃদ্ধাও উপযুক্ত চিকিৎসা আর পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে গেছেন। অথচ আমাদের দেশে প্রথম করোনাক্রান্ত শনাক্ত হয় মার্চের শেষার্ধে। এ পর্যন্ত তিনশ শতাধিক মানুষ ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। আক্রান্ত তো হাজার হাজার। স্তম্ভিত ও দিশেহারা গোটা জাতি। কারও জানা নেই এর শেষ পরিণতি কী।

আসলে এ সময়ে দরকার জাতীয় ঐক্য ও সমন্বয়। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। সর্বোপরি নিখাদ দেশপ্রেম। দেশপ্রেম আসলে স্লোগান আর গলাবাজির কোনো ব্যাপার নয়। সবকিছুর আগে দেশকে সঠিকভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি- ‘দেশকে ভালো না বাসলে তাকে ভালো করে জানবার ধৈর্য থাকে না, তাকে না জানলে তার ভালো করতে চাইলেও তার ভালো করা যায় না।’ বেশ গর্বের সঙ্গেই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।’ অর্থাৎ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও গরীয়ান। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ‘জননীর স্তন্যপানের যদি কোনো ঋণ থাকে, তবে তারও চেয়ে বড় ঋণ আমাদের দেশ-জননীর কাছে- যার জলবায়ু ও রসধারায় আমাদের প্রাণ মন দেহ অনুক্ষণ সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছে- সে দেশ আমার পিতার জননী, আমার জননীর জননী।’

দেশপ্রেম ও সচেতনতার একটিমাত্র উদাহরণ, তাও ভিয়েতনামেরই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট দেশ ভিয়েতনাম। পর্বতসঙ্কুল ও কৃষিপ্রধান এ রাষ্ট্রটি গত ৫০ বছরে অনেক দূর এগিয়েছে। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বলতে গেলে টানা প্রায় দেড় যুগ চলেছিল ভিয়েতনামিদের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ চলাকালে আপাত শান্ত একটি জায়গায় লক্ষ করা যায়, কয়েকজন মুক্তিসংগ্রামী এলাকাবাসী দখলদার বাহিনী দ্বারা বিধ্বস্ত ঘরদোর ও স্থাপনার ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি দুটি করে রড, ভাঙা ইট বা এরকম উপকরণ উদ্ধার করে সেখান থেকে সরিয়ে মাটির গর্তে সযত্নে পুঁতে রাখছে। তাদের আশঙ্কা, ওই এলাকায় আবারও যে কোনো সময় শত্রুবাহিনী হামলা চালাতে পারে। যুদ্ধের খবর সংগ্রহে তৎপর একজন বিদেশি সাংবাদিক এমনসব নষ্ট-পুরনো-পরিত্যক্ত উপকরণাদি যত্ন সহকারে এভাবে লুকিয়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে তারা জবাব দেয়, ‘একসময় যুদ্ধ থেমে যাবে, দেশ স্বাধীন হবে। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই আমাদের নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হবে। তখন উদ্ধার করা এবং সযত্নে রেখে দেয়া সামান্য কিছ্ওু আমাদের অনেক কাজে লাগবে।’ একেই বলা হয় আস্থা আর বিশ্বাস। আশাবাদ, দূরদর্শিতা, সর্বোপরি দেশপ্রেম। দেশমাতৃকার প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি কী পরিমাণ টান, দরদ ও ভালোবাসা এবং মনে আত্মবিশ্বাস থাকলে জাতির চরম সংকট, অনিশ্চয়তা ও ঘোর দুর্দিনেও এমনটি ভাবা ও করা যায়, তা স্থূল দৃষ্টি দিয়ে কারও পক্ষে উপলব্ধি করা বোধকরি সম্ভব নয়।

১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী সংঘটিত মরণপণ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এবং এর অব্যবহিত আগের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে দেশমাতৃকার মুক্তি ও বন্দনায় আমরাও সোচ্চার ও একতাবদ্ধ হয়েছিলাম। দেশপ্রেমের এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ কিংবা তখনকার ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিটি বোধকরি প্রত্যেক সচেতন মানুষের কানে আজও অনুরণিত হয়। কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমরা সেই আলোকোজ্জ্বল-গৌরবোজ্জ্বল চেতনাটি বেশিদিন ধরে রাখতে পারিনি। আজ নতুন করে ভাবনার উদয় হয়েছে- করোনা মোকাবেলা করতে হলে আমাদের ভিয়েতনামের মডেল অনুসরণ করতে হবে।

একই বা কাছাকাছি সময়ে বিদেশি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তিলাভ করি আমরা। আমাদের মতো এমন আরও দেশ রয়েছে। অথচ ওদের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের অবস্থানটি কোথায়? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সচেতনতা, এমনকি দেশপ্রেমের দিক থেকেও! পারস্পরিক সন্দেহ-সংশয় আর অবিশ্বাস-অনাস্থার মঝে থেকেই যেন আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি। একতা, সমন্বয়- এমনই কথা। আছে যা তা কেবলই গলাবাজি। করুণাময়, করোনা থেকে আমাদের রক্ষা করো। সবাইকে সঠিক পথে চালনা করো।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত