বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

ধূমপানে করোনা ঝুঁকি বেশি

  ড. অরূপরতন চৌধুরী ৩১ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রতি বছর ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে- ওই দিন থেকে তামাক বা ধূমপান ছেড়ে দিয়ে তামাকমুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া। সেই সঙ্গে তামাক ও ধূমপানের কারণে স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় : তামাক ও নিকোটিন থেকে তরুণদের বাঁচাও।

তামাকের কারণে বিশ্বে যে মৃত্যুহার তা এইচআইভি/এইডস, টিবি, প্রসূতিমৃত্যু, যানবাহন দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নরহত্যা ও ওষুধজনিত মৃত্যুর সর্বমোট সংখ্যার চেয়ে বেশি। সাম্প্রতিককালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৬৮ শতাংশ এবং নারী ৩২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তদের বয়সসীমা ২১ থেকে ৩০ বছর। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়ষ্কদের মধ্যেই করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি এবং এর কারণ ধূমপান কিনা তা গবেষণার বিষয়।

বর্তমানে করোনা মহামারীর সময়েও তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে ক্ষতিকর তামাকের ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তামাকের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করছে তামাক কোম্পানির বেপরোয়া মনোভাব, তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা। তামাক কোম্পানিগুলো করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে বিশেষ অনুমতি সংগ্রহ করে তাদের উৎপাদন চালু রেখেছে এবং নিজেদের কর্মচারী এবং তামাক শ্রমিকদের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু মানুষের জন্য করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। যেসব ব্যক্তির কো-মর্বিডিটি অর্থাৎ অন্য কোনো অসুখ রয়েছে, সেসব ব্যক্তির করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেশি হতে পারে। এবং এসব ব্যক্তি আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে ধূমপায়ী ব্যক্তিরা অন্যতম।

‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে’ প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা যায়, অধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ ধূমপায়ী জটিল অবস্থায় ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। তাদের কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে হয়েছে। এরপর তাদের বেশিরভাগই মারা গেছেন। এছাড়া ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের (বিএমজে) এক গবেষণা বলছে, দিনে একটি সিগারেট খেলেও হৃদরোগের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বাড়ে ৩০ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, ৫৭ শতাংশের মতো। কোভিড-১৯-এর কারণে কিছু দেশে অতিরিক্ত ধূমপায়ীদের মধ্যে ধূমপানের মাত্রা কমানোর একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তারা মনে করছেন, এতে তাদের ঝুঁকি কমছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ধূমপান কমানো নয়, ধূমপান একেবারে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

কোভিড-১৯ প্রতিরোধী ব্যবস্থার অন্যতম অঙ্গ হল শ্বাসতন্ত্র। আমাদের শ্বাসের সঙ্গে যেসব দূষিত পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে, তাদের বাইরে বের করে দিয়ে ফুসফুসকে সচল রাখার চেষ্টা করে শরীর। এর ফলে আমাদের শরীর সুস্থ থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা কমে গেলে ফুসফুসের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। আর করোনাভাইরাসের প্রধান লক্ষ্যই হল ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্রকে অকার্যকর করে দেয়া। কাজেই যে কোনোভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্বাসতন্ত্রকে সুস্থ রাখা।

প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের ফলে বিশ্বে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যার বড় একটি অংশ শিশু। বাংলাদেশে অকাল মৃত্যু ঘটানোর ক্ষেত্রে তামাকের অবস্থান পঞ্চম। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতি বছর তামাকের কারণে মারা যাবে ১ কোটি মানুষ। এর মধ্যে ৭০ লাখেরই অকাল মৃত্যু হবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে। এই মৃত্যুর বড় অংশই হবে ফুসফুস ক্যান্সার, সিওপিডি ও যক্ষার মতো ব্যাধি দ্বারা।

নারীদের মধ্যে এই হার ২৫.২ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ। দেশে ধোঁয়াবিহীন তামাক বা গুল, জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে নারী ২৪.৮ এবং পুরুষ ১৬.২ শতাংশ, যা মোটের হিসাবে ২০.৬ শতাংশ এবং ধূমপায়ী ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৩৬.২ ও নারী ০.৮ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হৃদরোগের কারণে মৃত্যু ৩০ শতাংশের, ক্যান্সারে মৃত্যুর ৩৮ শতাংশের, ফুসফুসে যক্ষার কারণে মৃত্যুর ৩৫ শতাংশের এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে মৃত্যুর ২০ শতাংশের জন্য ধূমপান দায়ী।

ইন্সটিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (২০১৩) গবেষণা অনুসারে, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। দেশে তামাকের এই ভয়াবহতা প্রতিরোধে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয় এবং ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে আরও যুগোপযোগী করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা পাস করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও তামাক কোম্পানির কৌশল ধূমপায়ী বা তামাকসেবীদের করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান প্রমাণিত উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ হচ্ছে তামাক ও সিগারেট। একটি সিগারেটের তামাকে রয়েছে প্রায় ৭০০০ ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও গ্যাস। এর মধ্যে ৭০টি পদার্থ ক্যান্সার বৃদ্ধির কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিগারেট বা তামাক থেকে ২৫টি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অল্প বয়সের শিশুদের জীবনের শুরুতেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।

ড. অরূপরতন চৌধুরী : একুশে পদকপ্রাপ্ত; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস; সাম্মানিক সিনিয়র কনসালটেন্ট ও অধ্যাপক, বারডেম হাসপাতাল

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত