করোনার সাম্য

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী ০২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশ-বিদেশ মিলে করোনাকালে লকডাউনের হিসাব করলে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে তা এখনও চলছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মুসলিম সম্প্রদায়ের রমজান ও ঈদ পার হল। রমজানে জাঁকজমকের সঙ্গে ইফতার পার্টি করা যায়নি, সবাই মিলে হোটেল-রেস্তোরাঁয় সাহরিও খাওয়া যায়নি।

ভালোবাসার মায়ায় জড়ানো পারিবারিক বন্ধনের এ দেশে ঈদ ও অন্যান্য উৎসবে কাপড়-চোপড় ও উপহার সামগ্রী কেনার ধুম পড়ে যায়। প্রিয়জনদের জন্য পকেট উজাড় করে কেনাকাটা চলতেই থাকে। আর এ কেনাকাটায় দিন-রাত যেন এক হয়ে যায়। আরেকটু সামর্থ্যবানরা এসব কেনাকাটায় চলে যান বিদেশে। অনেক ক্ষেত্রে ঐশ্বর্য, বিলাসিতা, অপচয়, অপব্যয়ের মনে হয় শেষ থাকে না।

সপ্তাহে সপ্তাহে অভিজাত রেস্তোরাঁয় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ডিনারে যাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটিতে দূর-রিসোর্ট, খামারবাড়ি, কক্সবাজার-কুয়াকাটা সৈকত, পার্বত্য জেলাগুলোর ট্যুরিস্টস্পট, দূর দেশের বালি, মরিশাস, সুইজারল্যান্ড যাওয়া, সেকেন্ড হোমে বসবাসরত স্ত্রী-সন্তানের কাছে হুট করে গিয়ে সারপ্রাইজ দেয়া অনেকের কাছে খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

এসব অনুষ্ঠান ও আয়োজন যখন চলে, তখন হয়তো জীর্ণশীর্ণ অভুক্ত কেউ থালা হাতে আমাদের দ্বারে দু’মুঠো ভাতের জন্য অপেক্ষায় থাকে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে এবং প্রতিদিন বাসাবাড়িতে আমরা কত খাবার নষ্ট করি, ফেলে দিই তার হিসাব কি সবসময় করি? নিজেকে নিয়ে মশগুল থাকা ও আনন্দ করার মধ্যে সুখ কতটুকু? জীবনে চাওয়া-পাওয়া সীমিত করা, বিলাসিতা, অপচয় থেকে সরে এসে সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও সৌন্দর্য নিহিত আছে। যে জিনিসগুলো সবাইকে নিয়ে উপভোগ করা যায় না, সবাইকে ভাগ দেয়া যায় না, সে ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সতর্ক ও সংযত হতে হবে।

দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত সহায়-সম্বলহীনরা যথোপযুক্ত চিকিৎসা পায় না, বিদেশেও যেতে পারে না। শুধু আর্থিক অনটনের কারণে মৃত্যুই তাদের নিয়তি। আর সামর্থ্যবানরা সামান্য সর্দি-কাশি, জ্বর হলেই ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর দৌড় দিচ্ছেন। দেশে রুটিন চেকআপও তাদের পছন্দ হয় না। তাদের আজকে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অসহায়রা দেখছে, শুধু তারাই নয়, বড় লোকরাও তাদের মতো দেশেই চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে সামর্থ্যহীন মানুষের হতাশা একটু হলেও কমছে, নিজের সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে। আমাদের দেশের ডাক্তারদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, তারা জটিল অস্ত্রোপচার, কঠিন রোগ ও বিশ্বমানের চিকিৎসা করতে সক্ষম। করোনা সংকট মোকাবেলায় তারাও বুক চিতিয়ে রোগীর সেবা করে যাচ্ছেন। তাদেরও ডেডিকেশন আছে, তাদের সম্মান দেখাতে হবে, তাদের ওপর আস্থা ও ভরসা রাখতে হবে।

যারা কখনও ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করেনি, নিজের রুমালটিতে কোনো দিন সাবান কচলিয়ে দেখেনি, সন্তানকে ঘরের কোনো কাজে সম্পৃক্ত করেনি, তারা সবাই আজ নিজের কাজ নিজে করছে। অন্তত ঘরের কাজে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। গৃহকর্মীরা একটি বাসায় কত ধরনের কাজ করে, দু’মুঠো খাওয়ার জন্য কত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, তাদের কাজেরও যে মূল্য ও গুরুত্ব আছে তা অনুধাবন করার সুযোগ পাচ্ছে। এতে হয়তো, ওইসব খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি আমাদের মতো হৃদয়হীনদের একটু হলেও সহানুভূতি আসছে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হচ্ছে।

যে মানুষটির ঘরে মনই টিকত না, রাতে শোবার আগে বাড়ি ফিরত, কবে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে একসঙ্গে আহার করেছিল মনে করতে পারেনি। সে মানুষটি কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও একত্রে আহার করছে, একসঙ্গে বসে সবাইকে নিয়ে গল্প-গুজব করছে, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। একটা ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছে। এতে স্ত্রী-সন্তানের প্রতি, পরিবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, ভালোবাসা বাড়ছে। ইতিবাচক পরিবার গঠনের একটি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে অনেকের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগই ছিল না। সবাই হয়ে গিয়েছিল যান্ত্রিক, জীবনকে সাজিয়েছিল ভিন্ন এক ছকে। তিনিও আজকে চক্ষুলজ্জার খাতিরে হোক বা দায়িত্ববোধ থেকেই হোক বা সময় পার করার জন্যই হোক আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কুশল বিনিময় করছেন, খোঁজখবর রাখছেন। মানুষ, মানুষের কাছ থেকে তো এ বিষয়গুলোই প্রত্যাশা করে। করোনা আমাদের এ ব্যাপারে একটি ভালো প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের জীবন এত ঠুনকো যে, একটি ছোট ভাইরাস যখন-তখন কেড়ে নিতে পারে প্রাণ। এটি অনেকের ভাবনায় আসতে শুরু করেছে। মানুষে মানুষে পার্থক্য তৈরি আর কত? জীবনটা ক’দিনের? অল্প চাহিদায় আমাদের জীবন সাজাতে হবে। কথায় কথায় ‘মানুষের জয় হবেই’ বলা এবং লোক দেখানো ‘জীবনের জয়গান’ গাওয়ার আগে অভাবীদের দীর্ঘশ্বাস পড়ে, যন্ত্রণা বাড়ে এমন কাজ ও আচরণ থেকে সরে আসতে হবে। করোনার বিভীষিকায় মানুষের মধ্যে কি এতটুকু বোধোদয় হয়নি? এত কিছুর পরও কি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে নিজেকে শামিল করতে পারব না? পারতে আমাদের হবেই।

করোনা পৃথিবীর বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ প্রাণ। তছনছ করে দিয়েছে অনেক পরিবারের হাসি ও আনন্দ। বিশ্ব অর্থনীতিতে নামিয়ে দিয়েছে অপূরণীয় ধস। কোটি কোটি মানুষকে করেছে বেকার। উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে উন্নয়নের চাকাকে। জানি না, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার পর এর খেসারত বিশ্ববাসীকে কতদিন দিতে হবে? আশাবাদীরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও ভালো কিছু আদায় করতে চায়। শত সমস্যায় জর্জরিত পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষণীয় কিছু খুঁজে বেড়ায়। করোনা হয়তো মানুষে মানুষে সমতা আনয়নের চেষ্টা করে গেছে। মানবজাতিকে অন্তত কিছু দিনের জন্য সমপ্লাটফর্মে নিয়ে এসেছে। লোভ-লালসা ও অন্যায় চাহিদার লাগাম যদি টেনে ধরতে না পারা যায়, তবে এর ওপর আবারও তৈরি হতে থাকবে ভেদাভেদের প্লাটফর্ম। আর এতে সৎ ও নিরীহরা থেকে যাবে তলানিতে। সমপ্লাটফর্ম রক্ষার জন্য আমরা কখনই করোনার স্থায়িত্ব চাইতে পারি না। কিন্তু এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষে মানুষে পার্থক্যগুলোকে কমিয়ে আনতে হবে। করোনা আমাদের মিথ্যা অহমিকা চুরমার করে দিয়ে গেছে, আমাদের অল্পে সন্তুষ্ট থাকার ভেতর দিয়ে জীবনযাপনের পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। এত হতাশা, এত যন্ত্রণা, এত মন্দ কিছুর মধ্যে এ প্রাপ্তিটুকুইবা কম কীসের?

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত