ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে আমেরিকা

  মাহমুদ রহমান ০৩ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জর্জ ফ্লয়েড এখন আর কোনো সাধারণ নাম নয়; একটি আন্দোলন। আমেরিকাজুড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে মানুষ। স্লোগান দিচ্ছে, ‘সে দ্য নেইম- জর্জ ফ্লয়েড’। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্ববাসীর দৃষ্টি এখন করোনাভাইরাসের ভয়ঙ্কর তাণ্ডব উপেক্ষা করে আমেরিকার বর্ণবাদী ভাইরাসের দিকে।

জর্জ ফ্লয়েড বড় হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরে। প্রায় ৬ বছর আগে তিনি হিউস্টন ছেড়ে চলে আসেন মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনেপোলিস শহরে। সেখানে তিনি কাজ করছিলেন একটি রেস্টুরেন্টের গার্ড হিসেবে। আর দশজন আফ্রিকান-আমেরিকানের মতোই ছিল তার জীবন। কাজ, সংসার সবই ছিল তার। আমেরিকার সৌন্দর্য ও উদারতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর বর্ণবাদী ঘৃণা কেড়ে নিল তার জীবন।

যারা শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার কর্তৃক জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাদৃশ্য ইউটিউবে দেখেছেন, তারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। পুলিশ অফিসার ডেরেকের হাঁটুর নিচে চেপে ধরা জর্জ ফ্লয়েডের ঘাড়। ফ্লয়েড চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আই কান্ট ব্রেথ’- আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। কিন্তু পুলিশ অফিসার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই হাঁটুর চাপ অব্যাহত রেখেছিল। পথচারীরাও পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছিল ফ্লয়েডের চিৎকারের কথা।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক পায়ের নিচের আদম সন্তানটির চিৎকারকে পাত্তা দিচ্ছিল না। এক সময় জর্জ ফ্লয়েড নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এভাবেই ঠাণ্ডা মাথায় নিরস্ত্র কালো আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের জীবনাবসান হয় শ্বেতাঙ্গ পুলিশের পায়ের নিচে, যা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি। আমরা বাস করছি মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথিত স্বর্গ যুক্তরাষ্ট্রে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৫ মে। মিনেপোলিসের এক দোকান কর্মচারী ৯১১-এ কল দিয়ে পুলিশকে জানায় তার দোকানে সিগারেটের বিল হিসেবে ২০ ডলারের একটি জাল নোট দিয়েছে একজন লোক। লোকটি মাতাল ছিল। তাকে বলা সত্ত্বেও সিগারেটের বিলের জাল নোটটি বদলে দেয়নি। এবং লোকটি এখনও পার্কিং লটে গাড়িতে বসে আছে। ফোনে এ তথ্য পেয়ে পুলিশ পার্কিংয়ে এসে জর্জ ফ্লয়েডকে গাড়িতে পায়। তারপর তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ধরে নিয়ে যায়। ফ্লয়েড কোনো ধরনের প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি। তারপর তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নেয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে রাস্তায় ফেলে ঘাড়ের ওপর হাঁটু চেপে ধরা হয়।

এসবই বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে। ২০ ডলারের জালিয়াতি সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। যদি সত্য হয়, তবুও নিরস্ত্র কোনো ব্যক্তিকে এভাবে জীবন দিতে হবে, এটা সভ্য দুনিয়া মানতে পারছে না। মানতে পারছে না আমেরিকা। তাই পুলিশ অফিসারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে থার্ড ডিগ্রি মার্ডার কেস। তবুও দিন দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভের সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে।

প্রতিবাদী মানুষ থার্ড ডিগ্রি মার্ডার কেসে খুশি নয়। তাদের দাবি, ইচ্ছাকৃত খুনের অভিযোগ আনতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আমেরিকায় প্রায়ই পুলিশের উগ্র শ্বেতাঙ্গ যে অংশটির নির্যাতনের শিকার হয় আফ্রিকান-আমেরিকানরা, তার অবসান হতে হবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এসব নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। সাদা-কালো ভেদাভেদ ভুলে সব বর্ণ ও কমিউনিটির মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করছে। কারফিউ অমান্য করেও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে। মিনেসোটায় একটি পুলিশ স্টেশনসহ অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়েছে। এরকম জ্বালিয়ে দেয়া এক রেস্টুরেন্টের মালিক বাংলাদেশি-আমেরিকান রুহুল ইসলাম। রুহুলকে তার ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়ে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রেস্টুরেন্ট আবার মেরামত করে ব্যবসা শুরু করা যাবে। কিন্তু মানুষের জীবন পাওয়া যাবে না। তাই এ হত্যার ন্যায়বিচার চাই। এই ন্যায়বিচারের দাবি নিউইয়র্ক, ডেট্রয়েট, আটলান্টা, মায়ামি সর্বত্র, সব বিবেকবান মানুষের।

এমনকি হত্যার দায়ে অভিযুক্ত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেকের স্ত্রী কেলিও এই নির্মম ঘটনায় মর্মাহত। ঘটনার প্রতিবাদে সে ডেরেকের বিরুদ্ধে ডিভোর্স মামলা ঠুকে দিয়েছে। সবচেয়ে আশাপ্রদ চিত্রটি ধরা পড়েছে ফ্লোরিডার মায়ামিতে। মায়ামি পুলিশ হেডকোয়ার্টার অভিমুখে যখন বিক্ষোভকারীরা যায়, তখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের টিয়ারগ্যাস দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেনি। তাদের ওপর শক্তিও প্রয়োগ করেনি।

তারা হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নিচু করে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে জর্জ ফ্লয়েডের জন্য সমবেদনাসহ পুলিশের পক্ষ থেকে ক্ষমা চায়। এতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। পুলিশের আচরণে বিক্ষোভকারীরা বিমোহিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অবশেষে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ কোলাকুলি করে। কান্না ও প্রার্থনায় রূপ নেয় মায়ামির বিক্ষোভ। এ দৃশ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমেরিকার সৌন্দর্য ও শক্তির উৎস।

বস্তুত আমেরিকার বেশির ভাগ আইন-কানুন এ রকম নানা দুঃখজনক অভিজ্ঞতার পর প্রবর্তন করা হয়েছে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলন থেকে আট ঘণ্টা শ্রমের অধিকার অর্জন করে আমেরিকাসহ বিশ্বের শ্রমিকরা। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ১৮৬৫ সালের ১৩তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আব্রাহাম লিঙ্কনের হাত ধরে আফ্রিকান-আমেরিকানরা দাসপ্রথার অভিশাপমুক্ত হয়। তারপর ১৪তম সংশোধনীর বলে ১৮৬৮ সালে নাগরিক হিসেবে সমঅধিকারের স্বীকৃতি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে আফ্রিকান-আমেরিকানরা ভোটের অধিকার পায়।

এভাবে আইন আমেরিকার সবাইকে সমান অধিকার দিলেও ক্ষুদ্র যে অংশটির মনে এখনও অতীতের বর্ণবাদী মনোভাব রয়েছে, তারাই আইনগুলো ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমেরিকানদের সম্মিলিত প্রতিরোধ সব সময় তাদের এ অপচেষ্টা ভণ্ডুল করে দেয়। এবারও তা-ই হবে নিশ্চয়ই। অবশ্যই জর্জ ফ্লয়েডের জীবন বৃথা যাবে না।

মাহমুদ রহমান : যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত মর্টগেজ ব্যাংকার ও রিয়েলটর

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : কৃষ্ণাঙ্গ হত্যায় অগ্নিগর্ভ যুক্তরাষ্ট্র

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত