করোনা ভাবনা

  ডা. মাহবুবা আক্তার চৌধুরী ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবন থেকে পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল সময়কে কখনও ছাড় দিতে হয় না। কারও ওপর খুব বেশি ভরসা করতে হয় না। ভবিষ্যতের সুখস্বপ্নে বর্তমানকে বিসর্জন দিতে হয় না। রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্য সম্পর্ক কখনও আপন হয় না।

জীবন হচ্ছে বুলেটের মতো, বেরিয়ে গেল তো গেলই। জন্ম নিতে নিতেই হাঁটাহাঁটি শুরু, হাঁটতে না হাঁটতেই স্কুলে যাওয়া শুরু, তারপর তো রকেটে চড়ে বসা।

আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে জীবনের প্রতিটি পল, প্রতিটি মুহূর্ত ধাবমান। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাকে-মুখে কিছু গুঁজে দিয়ে স্কুলে দৌড়ানোর চেয়েও দ্রুততায় জীবন পালিয়ে গেল। রূপ রস গন্ধ- কিছুই আস্বাদন করতে পারলাম না। না ঠিকমতো দেখতে পেলাম, না ভোগ করতে পারলাম; তার আগেই বার্ধক্য ঠক ঠক ঠক... কড়া নাড়তে শুরু করল। কত হাহাকার বুকের কোণে শ্বাস ফেলে যায়, কত অশ্রুবিন্দু চোখের কোণে ঠাঁই করে নেয়, বয়স ছাড় দেয় না কানাকড়িও। হাত ধরে নিয়ে চলে কবরের দিকে।

অসুখ-বিসুখ জেঁকে বসতে পারল না এইবেলা, তার আগেই চীন দেশ থেকে কী এক মহামারী এসে হাজির, প্রতি মুহূর্তে চোখ রাঙাচ্ছে! চোখ সরিয়ে নেব সেই উপায়ও নেই। দশ দিগন্ত গ্রাস করে নিয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে যেন। জানান দিচ্ছে, এই এলাম। কোথায় পালিয়ে বেড়াব, কোথায় নিজেকে লুকাব, বুঝতে পারি না। কড়া নাড়ে কে? ওই বুঝি এলো! হায়, একটু সময় কি দেয়া যায়? আলমারির তাকে থরে থরে সাজানো জামার ভাঁজ এখনও ভাঙা হয়নি, হ্যাঙ্গারে ঝোলানো কয়েকটি জামা, এখনও গায়ে তুলিনি; গেলবার কলকাতা থেকে আনা ফ্যাশনেবল জুতাগুলো, নন্দন থেকে কেনা অ্যান্টিক গয়নাগুলো, জাপান থেকে আনা কসমেটিকগুলো, ফ্রান্স থেকে আনা সুগন্ধিগুলো, বই আর ফেসবুকের দেয়াল থেকে পাওয়া কল্পনাগুলো, দু’চোখে জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো- কত কী জমে আছে আমাদের ক্ষুদ্র জীবনের ফ্রেমে। হে করুণাময়, কিছুটা সময় কি আমাদের দেয়া যায়, কিছুটা আয়ু? আমাদের যে জীবনের কতকিছু পাওয়া বাকি- একটু সুখ, একটু বিশ্বাস, একটু ভালোবাসা, বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে এক কাপ চা খাওয়া, মেয়ের হাত ধরে সবুজ ঘাসের গালিচায় ছুটোছুটি করা, দোলনচাঁপার ঘ্রাণে পাগল হওয়া, ঝুম বৃষ্টিতে মনের সুখে কাকভেজা হওয়া, কুয়াশার জোছনায় বাঁশির সুরে হারিয়ে যাওয়া, তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হতে হতে আল্পসের চূড়ার মাইনাস ৪০ ডিগ্রির শীতল স্মৃতি রোমন্থন করা। বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া কুয়াশায় কাঁপতে কাঁপতে মালদ্বীপের বিরক্তিকর ট্রপিকাল আবহাওয়ার তপ্ত দিনগুলো মনে করা। সাবমেরিন ডাইভ দেব বলে গিয়েছিলাম, সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, সমুদ্রের উত্তাল স্রোত বাদ সাধল। এক জীবনের সব সাধ পূরণ হতে দেবে না। সব কোথায়, কিছুই তো পূরণ হল না!

হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর, আরও কিছু দিন কি আমাদের ঝুলিতে ভরে দেয়া যায়? আরও কিছু মুহূর্ত? এক জীবনে যে আমাদের কতকিছুই পাওয়ার বাকি, সবই কেবল হাহাকার। আরেকটা জনম কি দেয়া যায় না? মৃত্যুর আগে আরেকটা নতুন সূচনা?

ডা. মাহবুবা আক্তার চৌধুরী : চিকিৎসক

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত