রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা: লোকসানি খাতকে নিরুৎসাহিত করাই শ্রেয়

  সম্পাদকীয় ০৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

শ্রমিকদের ‘শতভাগ’ পাওনা মিটিয়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার। এর ফলে ২০১৫ সালের সর্বশেষ মজুরি কাঠামো অনুযায়ী প্রায় ২৫ হাজার পাটকল শ্রমিকের পাওনা এককালীন পরিশোধ করতে সরকারের ব্যয় হবে কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে ৮ হাজার ৯৫৪ জন পাটকল শ্রমিক অবসরে গেছেন, তাদের সব পাওনাও একসঙ্গে বুঝিয়ে দেয়া হবে। জানা গেছে, গৃহীত প্রক্রিয়ায় কাউকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে না; বরং পাওনা পরিশোধ করে তাদের অবসরে পাঠানো হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হল, পাটকল শ্রমিকদের পাওনার অর্ধেক নগদ এবং বাকি অর্ধেক তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র আকারে দেয়ার ফলে প্রত্যেক শ্রমিক ‘বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের’ সুযোগ পাচ্ছেন এবং এর ফলে সবাই প্রতি তিন মাস অন্তর বেশ ভালো অঙ্কের মুনাফা পাবেন। এটি শ্রমিকদের জন্য একটি বাড়তি আর্থিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করবে, যা বলাই বাহুল্য।

স্বাধীনতার পর দেশের সব পাটকল জাতীয়করণ করা হয়, যার ফলে ৭৮টি পাটকল নিয়ে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে ৩৫টি পাটকল সাবেক মালিকদের কাছে দিয়ে দেয়া হয়। বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে ২৬টি পাটকল রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে একটি বাদে বাকিগুলো উৎপাদনে আছে। এসব পাটকলে ২৪ হাজার ৮৬৬ জন স্থায়ী শ্রমিকের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক রয়েছে আরও প্রায় ২৬ হাজার।

বিজেএমসি উৎপাদিত পাটজাত পণ্য এক সময় ছিল দেশের প্রধান রফতানি খাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সংস্থাটি বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিয়ে এসেছে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোয় শ্রমিকরাও ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার নিরিখে সরকারপ্রধানকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর পুঞ্জীভূত ক্ষতি বা লোকসানের পরিমাণ অন্তত ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এ লোকসানের কারণগুলো অজানা নয়। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা, পাট ক্রয়ে সিন্ডিকেটের প্রভাব, আধুনিকায়নে গাফিলতি, বাজারজাতকরণে যথাযথ উদ্যোগের অভাব ইত্যাদি।

এর ফলে দেখা গেছে, পাটপণ্য তৈরিতে বৈচিত্র্য বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী যখন পাটের কদর বাড়ছে এবং বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তখনও বিজেএমসির অন্তর্ভুক্ত পাটকলগুলোর অবদান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এজন্য দায়ী মূলত প্রতিষ্ঠানটির মাথাভারি প্রশাসন ও দুর্নীতি। এ স্বল্প সম্পদের দেশে দিনের পর দিন ভর্তুকি দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো গরিবের হাতি পোষার শামিল হলেও সেদিকে কেউ ভ্রূক্ষেপ করেনি।

তবে শুধু বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকলগুলোই নয়, অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই লোকসানে চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাঁধে বিপুল অঙ্কের দায়দেনাও রয়েছে। অপরিমেয় লোকসানের কারণে সরকার বা কর্পোরেশনের পক্ষে সেগুলো পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়াই স্বাভাবিক। লোকসানের বোঝা টানতে গিয়ে বাড়তি চাপ পড়ছে জাতীয় বাজেটের ওপর। মূলত এ প্রেক্ষাপটেই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখন পাটকল শ্রমিকরা যাতে সিদ্ধান্তমতো ন্যায্য পাওনা ঠিকমতো পান, তা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রধান কাজ।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত