করোনাকালে আষাঢ়ী পূর্ণিমা

  ড. সুকোমল বড়ুয়া ০৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমার আবেদন বৌদ্ধ বিশ্বে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। থেরবাদী বৌদ্ধ দেশগুলোয় আজ থেকে ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস ব্রত শুরু। বিহারের ভিক্ষু-শ্রামণ, উপাসক-উপাসিকা ও গৃহীরা আজ থেকে তিন মাসের জন্য ধ্যান-সমাধি ও প্রজ্ঞা সাধনা করবেন। অতি যত্নের সঙ্গে ধর্মবিনয় অনুশীলন করবেন, শিক্ষা দেবেন এবং শাস্ত্র আলোচনা করবেন। প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য বৃক্ষরোপণও করা হবে।

এ পূর্ণিমার আরও বিশেষত্ব হল, আষাঢ়ী পূর্ণিমার এই শুভ তিথিতেই রাজকুমার সিদ্ধার্থ রানী মহামায়ার গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। বৌদ্ধ পরিভাষায় একে বলা হয় মহাভিনিষ্ক্রমন। বুদ্ধত্ব লাভের পর এ দিবসেই তিনি তার অধীত নবলব্ধধর্ম ‘ধর্মচক্র প্রবর্তনসূত্র’রূপে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যের কাছে প্রথম প্রচার করেন সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে। সেদিন তার প্রচারিত ধর্মের মূল আবেদন ছিল- জগৎ দুঃখময়, জীবন অনিত্য, জগতের সব সংস্কার অনিত্য। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যুই শাশ্বত। এই দুঃখময় সংসার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় তৃষ্ণাক্ষয়, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞার সাধনা এবং আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ তথা আটটি বিশুদ্ধ পথে চলা।

এ পূর্ণিমার আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল, এ শুভ তিথিতেই ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর গণ্ডম্ব বৃক্ষমূলে প্রতিহার্য প্রদর্শন করেন এবং মাতৃদেবীকে দর্শন ও ধর্মদেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। আমরা জানি, রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্মের পরই রানী মহামায়ার মৃত্যু হয়েছিল। এ কৃতজ্ঞতাবোধে তিনি তার প্রাপ্ত ধর্মজ্ঞান তার মাতৃদেবীকে বিতরণ তথা দর্শনের জন্যই স্বর্গে গিয়েছিলেন। রানী মহামায়ার মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ বোন গৌতমীই পরবর্তীকালে রাজকুমার সিদ্ধার্থকে লালনপালন করেন। এজন্য সিদ্ধার্থের অপর নাম হয়েছিল গৌতম।

বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ তিন মাসের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ত্রৈমাসিক এ বর্ষাবাসের মধ্যে ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীসংঘ ধর্ম-বিনয়ের বহুবিধ আচার-আচরণ ও বিধিবদ্ধ নিয়ম-নীতি পালন ও অনুশীলন বাধ্যতামূলক। আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা ‘ছাদাং’ বলে অভিহিত করেন। ‘ছাদাং’ বার্মিজ শব্দ; এর অর্থ উপোসথ। বর্ষাবাসের তিন মাসে অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপোসথ পালন করা হয়। এ সময়ে বিহারে গিয়ে ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ নর-নারী ও উপাসক-উপাসিকারা উপোসথব্রত গ্রহণ করেন। উপোসথব্রতীরা অষ্টশীল গ্রহণ করেন এবং তা ২৪ ঘণ্টার জন্য রক্ষা করেন।

বাংলাদেশের বৌদ্ধরা যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে এ উৎসব পালন করেন। দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে সকালে বুদ্ধ পূজা, ভিক্ষুসংঘের পিণ্ডদান, শীলগ্রহণ এবং বিকালে ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। আষাঢ়ী পূর্ণিমার তাৎপর্যসহ বৌদ্ধ ধর্মদর্শনের নানাবিধ দিক আলোচনা করা হয়; বিশেষ করে দুর্লভ মানবজীবনের সার্থকতার জন্য বৌদ্ধজীবন পদ্ধতিতে যেসব নিয়ম-নীতি, শিক্ষা, সদাচার পালনীয় তা এবং ইহ-পারলৌকিক শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি আনয়নের জন্য যেসব ব্রত বা কর্ম বৌদ্ধশাস্ত্রে বিধৃত, তা তুলে ধরা হয়।

আজ এমন এক সময়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা উদযাপন করা হচ্ছে, যখন সারা পৃথিবীর মানুষ করোনাভাইরাসের সংক্রমণে আতঙ্কিত। মানবজীবনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ব্রত, অধিষ্ঠান সবই মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা পৃথিবীর মানুষকে করোনাসহ সব ধরনের রোগ-শোক থেকে দূরে রাখুক- এটাই আজ আমাদের প্রার্থনা। ‘সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তু’- জগতের সব জীব সুখী হোক।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত