সংক্রামক আইন কী ও কেন
jugantor
সংক্রামক আইন কী ও কেন

  শাহ জাহান আল সাদাফ  

২৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না কোন আইনের ক্ষমতাবলে ১৬ এপ্রিল সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতর ওই ঘোষণা দেয়। সঠিক প্রচারণার অভাবে অনেকেরই ধারণা নেই সংক্রামক ব্যাধি আইন সম্পর্কেও।

দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয় ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, নির্মূল) আইন-২০১৮’-এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে। মূলত বাংলাদেশের জনসংখ্যা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ আইনটি করা হয়।

জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসে এটি একটি যুগোপযোগী আইন। এ আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধানও স্পষ্ট। বিশেষ আইন মানে আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। আইনটিতে মোট ৩৫টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ ধারায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কার‌্যাবলি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
 

স্বাস্থ্য অধিদফতর এ আইনের আওতায় সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে যে কোনো গণজমায়েত, পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণাসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। আইনটির ১১ ধারায় সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ১৪নং ধারা অনুযায়ী সংক্রমিত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখার সুযোগ আছে। এছাড়া ১৮ ও ১৯ ধারা অনুযায়ী কোনো যানবাহনে সংক্রামক জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে ওই যানবাহনের মালিককে তা জীবাণুমুক্তকরণের আদেশ দেয়া যাবে এবং প্রয়োজনে জব্দও করা যাবে। আইনের ২০ ধারায় বলা আছে, ‘সংক্রামক রোগে কেউ মৃত্যুবরণ করিলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশনা মোতাবেক দাফন বা সৎকার করিতে হইবে।’

আইনটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হল ২৪, ২৫ ও ২৬। সংক্রামক রোগ গোপন করা যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ আইন ভঙ্গ করলে যে শাস্তি ও দণ্ড দেয়ার বিধান আছে, তা এ ধারাগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও আইন অমান্যকারীদের শাস্তি দেয়া যায়।
 

২৪ ধারামতে, যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তর ঘটান বা ঘটাতে সাহায্য করেন বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার স্পর্শে আসার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তার কাছে গোপন করেন, তাহলে ওই অপরাধের জন্য তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
 

২৫ ধারার বিধানমতে, যদি কোনো ব্যক্তি মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাধা দেন বা নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানান, তাহলে তিনি তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
 

২৬ ধারার বিধানমতে, সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা সত্ত্বেও কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল/মিথ্যা তথ্য দিলে তার শাস্তি দুই মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। তাছাড়া এ আইনে অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অপরাধগুলো অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য, যা আইনের ২৭ ও ২৮ ধারায় আলোচনা করা হয়েছে।

আইনটি দুই পদ্ধতিতে প্রয়োগ হতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করতে চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তা সম্ভব। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রজ্ঞাপনের আলোকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দিতে পারেন।

অথবা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেভাবে মামলা হয়, সেভাবে করা যাবে। দেশের আইনজ্ঞরা মনে করেন, এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে রোগ গোপন করার মতো অপরাধ কমে যাবে।

শাহ জাহান আল সাদাফ : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

সংক্রামক আইন কী ও কেন

 শাহ জাহান আল সাদাফ 
২৪ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না কোন আইনের ক্ষমতাবলে ১৬ এপ্রিল সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতর ওই ঘোষণা দেয়। সঠিক প্রচারণার অভাবে অনেকেরই ধারণা নেই সংক্রামক ব্যাধি আইন সম্পর্কেও।

দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয় ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, নির্মূল) আইন-২০১৮’-এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে। মূলত বাংলাদেশের জনসংখ্যা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ আইনটি করা হয়।

জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসে এটি একটি যুগোপযোগী আইন। এ আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধানও স্পষ্ট। বিশেষ আইন মানে আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। আইনটিতে মোট ৩৫টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ ধারায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কার‌্যাবলি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর এ আইনের আওতায় সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে যে কোনো গণজমায়েত, পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণাসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। আইনটির ১১ ধারায় সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ১৪নং ধারা অনুযায়ী সংক্রমিত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখার সুযোগ আছে। এছাড়া ১৮ ও ১৯ ধারা অনুযায়ী কোনো যানবাহনে সংক্রামক জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে ওই যানবাহনের মালিককে তা জীবাণুমুক্তকরণের আদেশ দেয়া যাবে এবং প্রয়োজনে জব্দও করা যাবে। আইনের ২০ ধারায় বলা আছে, ‘সংক্রামক রোগে কেউ মৃত্যুবরণ করিলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশনা মোতাবেক দাফন বা সৎকার করিতে হইবে।’

আইনটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হল ২৪, ২৫ ও ২৬। সংক্রামক রোগ গোপন করা যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ আইন ভঙ্গ করলে যে শাস্তি ও দণ্ড দেয়ার বিধান আছে, তা এ ধারাগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও আইন অমান্যকারীদের শাস্তি দেয়া যায়।

২৪ ধারামতে, যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তর ঘটান বা ঘটাতে সাহায্য করেন বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার স্পর্শে আসার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তার কাছে গোপন করেন, তাহলে ওই অপরাধের জন্য তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৫ ধারার বিধানমতে, যদি কোনো ব্যক্তি মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাধা দেন বা নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানান, তাহলে তিনি তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৬ ধারার বিধানমতে, সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা সত্ত্বেও কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল/মিথ্যা তথ্য দিলে তার শাস্তি দুই মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। তাছাড়া এ আইনে অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অপরাধগুলো অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য, যা আইনের ২৭ ও ২৮ ধারায় আলোচনা করা হয়েছে।

আইনটি দুই পদ্ধতিতে প্রয়োগ হতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করতে চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তা সম্ভব। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রজ্ঞাপনের আলোকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দিতে পারেন।

অথবা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেভাবে মামলা হয়, সেভাবে করা যাবে। দেশের আইনজ্ঞরা মনে করেন, এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে রোগ গোপন করার মতো অপরাধ কমে যাবে।

শাহ জাহান আল সাদাফ : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]