শাজাহান সিরাজ শিক্ষানুরাগী ছিলেন
jugantor
শাজাহান সিরাজ শিক্ষানুরাগী ছিলেন

  জহুরুল হক বুলবুল  

২৭ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যে কয়জন ছাত্রনেতা স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন শাজাহান সিরাজ। তিনি ছিলেন ‘চার খলিফার’ একজন। ছিলেন অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, তুখোড় ছাত্রনেতা।

যে কয়জন ছাত্রনেতা স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন শাজাহান সিরাজ। তিনি ছিলেন ‘চার খলিফার’ একজন। ছিলেন অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, তুখোড় ছাত্রনেতা।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের দেখলে বিষণ্নতার মাঝেও মনটা ভালো হয়, খুব আপনজন মনে হয়; এমনই একজন মানুষ ছিলেন শাজাহান সিরাজ। আমার সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান অনেক হলেও তিনি ছিলেন সবার কাছে ভাই। শাজাহান সিরাজের নাম আমার এলাকায় মানুষের মুখে-মুখে শুনতাম শৈশব থেকে।

রক্ত-মাংসের শাজাহান সিরাজকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সবে ঢাকায় এসেছি। একদিন দুপুরে এক সাংবাদিক ভাইয়ের সঙ্গে শাজাহান সিরাজের মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বাসায় যাই।

আমাদের পরিচয় জেনে শুরু করলেন নানা গল্প। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি কোনোটাই বাদ গেল না। মনে হল যেন কত যুগের পরিচয়। দুপুরে না খেয়ে আসতে দিলেন না কিছুতেই। বিদায় নেয়ার সময় আবার আসার আমন্ত্রণ জানালেন।

এরপর ১৯৯২ সালে শাজাহান সিরাজ প্রতিষ্ঠিত কালিহাতী কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। কলেজের অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার সবাই তাকে ভাই বলে ডাকতেন। কেউ স্যার বললে আপত্তি করতেন তিনি। কালিহাতী উপজেলায় দুটো কলেজ থাকলেও উপজেলা সদরে কোনো কলেজ ছিল না।

শাজাহান সিরাজ ১৯৭৯ সালে উপজেলা সদরে কালিহাতী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইচ্ছে করলেই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতার মতো কলেজটি নিজের নামে বা তার বাবার নামে করতে পারতেন। তিনি তা না করে কলেজটির নামকরণ করেন ‘কালিহাতী কলেজ’।

তার অসুস্থতার মধ্যে কয়েক মাস আগে কলেজটির নাম হয়েছে কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ। শাজাহান সিরাজ কখনও এ কলেজের সভাপতি হননি। তিনি সব সময় ছিলেন পরিচালনা পরিষদের সদস্য মাত্র।

অনেকবার কলেজের কাজে শাজাহান সিরাজের বাসায় গেছি। তিনি কলেজের কথা শুনলে যত কাজই থাক সব বন্ধ করে আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দফতরে টেলিফোন করতেন।

কলেজে বিএসসি ডিগ্রি খোলার সময় গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি কিনতে ঢাকায় যাই আমরা কয়েকজন। এ সময় শাজাহান ভাইয়ের বাসাতেও গিয়েছিলাম। কথা প্রসঙ্গে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কথা বলি।

এত যন্ত্রপাতি নিয়ে বাসে আসা আমাদের জন্য কষ্টকর হবে ভেবে সন্ধ্যায় তিনি তার নিজের গাড়িতে করে যন্ত্রপাতিসহ আমাদের কালিহাতী নিয়ে এলেন। যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাজাহান সিরাজের কাছে ছিল সন্তানের মতো।

তিনি শিক্ষকদের খুব শ্রদ্ধা করতেন। শিক্ষক মিলনায়তনের ক্ষুদ্র পরিসরে শিক্ষকদের সঙ্গে কখনও বসে কথা বলতেন না। আমাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েই কথা বলতেন। তার রাজনৈতিক দলের দুজন সিনিয়র নেতা কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছিলেন। এ সংবাদ পেয়ে তিনি ওই নেতাদের সাবধান করে দেন শিক্ষকদের সঙ্গে এরকম আচরণ না করতে।

শাজাহান সিরাজ একটি দল করলেও তার প্রতিষ্ঠিত কলেজে সব দলের সব মতের মানুষের নিয়োগ পেতে এবং চাকরি করতে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি কোনোদিন তার নির্বাচনে কলেজের কোনো শিক্ষক-কর্মচারী, এমনটি কোনো শিক্ষার্থীকেও তার পক্ষে কাজ করতে বলেননি। সংকীর্ণ মনোভাব নিয়ে চলেননি তিনি কখনও।

চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্বরূপ সন্ধান ও কর্মের মূল্যবিচার জাতির কর্তব্য। এ কর্তব্য সাধনে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হয়।

জহুরুল হক বুলবুল : সহকারী অধ্যাপক, কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ, টাঙ্গাইল

শাজাহান সিরাজ শিক্ষানুরাগী ছিলেন

 জহুরুল হক বুলবুল 
২৭ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
যে কয়জন ছাত্রনেতা স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন শাজাহান সিরাজ। তিনি ছিলেন ‘চার খলিফার’ একজন। ছিলেন অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, তুখোড় ছাত্রনেতা।
ফাইল ছবি

যে কয়জন ছাত্রনেতা স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন শাজাহান সিরাজ। তিনি ছিলেন ‘চার খলিফার’ একজন। ছিলেন অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, তুখোড় ছাত্রনেতা।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের দেখলে বিষণ্নতার মাঝেও মনটা ভালো হয়, খুব আপনজন মনে হয়; এমনই একজন মানুষ ছিলেন শাজাহান সিরাজ। আমার সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান অনেক হলেও তিনি ছিলেন সবার কাছে ভাই। শাজাহান সিরাজের নাম আমার এলাকায় মানুষের মুখে-মুখে শুনতাম শৈশব থেকে।

রক্ত-মাংসের শাজাহান সিরাজকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সবে ঢাকায় এসেছি। একদিন দুপুরে এক সাংবাদিক ভাইয়ের সঙ্গে শাজাহান সিরাজের মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বাসায় যাই।

আমাদের পরিচয় জেনে শুরু করলেন নানা গল্প। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি কোনোটাই বাদ গেল না। মনে হল যেন কত যুগের পরিচয়। দুপুরে না খেয়ে আসতে দিলেন না কিছুতেই। বিদায় নেয়ার সময় আবার আসার আমন্ত্রণ জানালেন।

এরপর ১৯৯২ সালে শাজাহান সিরাজ প্রতিষ্ঠিত কালিহাতী কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। কলেজের অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার সবাই তাকে ভাই বলে ডাকতেন। কেউ স্যার বললে আপত্তি করতেন তিনি। কালিহাতী উপজেলায় দুটো কলেজ থাকলেও উপজেলা সদরে কোনো কলেজ ছিল না।

শাজাহান সিরাজ ১৯৭৯ সালে উপজেলা সদরে কালিহাতী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইচ্ছে করলেই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতার মতো কলেজটি নিজের নামে বা তার বাবার নামে করতে পারতেন। তিনি তা না করে কলেজটির নামকরণ করেন ‘কালিহাতী কলেজ’।

তার অসুস্থতার মধ্যে কয়েক মাস আগে কলেজটির নাম হয়েছে কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ। শাজাহান সিরাজ কখনও এ কলেজের সভাপতি হননি। তিনি সব সময় ছিলেন পরিচালনা পরিষদের সদস্য মাত্র।

অনেকবার কলেজের কাজে শাজাহান সিরাজের বাসায় গেছি। তিনি কলেজের কথা শুনলে যত কাজই থাক সব বন্ধ করে আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দফতরে টেলিফোন করতেন।

কলেজে বিএসসি ডিগ্রি খোলার সময় গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি কিনতে ঢাকায় যাই আমরা কয়েকজন। এ সময় শাজাহান ভাইয়ের বাসাতেও গিয়েছিলাম। কথা প্রসঙ্গে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কথা বলি।

এত যন্ত্রপাতি নিয়ে বাসে আসা আমাদের জন্য কষ্টকর হবে ভেবে সন্ধ্যায় তিনি তার নিজের গাড়িতে করে যন্ত্রপাতিসহ আমাদের কালিহাতী নিয়ে এলেন। যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাজাহান সিরাজের কাছে ছিল সন্তানের মতো।

তিনি শিক্ষকদের খুব শ্রদ্ধা করতেন। শিক্ষক মিলনায়তনের ক্ষুদ্র পরিসরে শিক্ষকদের সঙ্গে কখনও বসে কথা বলতেন না। আমাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েই কথা বলতেন। তার রাজনৈতিক দলের দুজন সিনিয়র নেতা কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছিলেন। এ সংবাদ পেয়ে তিনি ওই নেতাদের সাবধান করে দেন শিক্ষকদের সঙ্গে এরকম আচরণ না করতে।

শাজাহান সিরাজ একটি দল করলেও তার প্রতিষ্ঠিত কলেজে সব দলের সব মতের মানুষের নিয়োগ পেতে এবং চাকরি করতে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি কোনোদিন তার নির্বাচনে কলেজের কোনো শিক্ষক-কর্মচারী, এমনটি কোনো শিক্ষার্থীকেও তার পক্ষে কাজ করতে বলেননি। সংকীর্ণ মনোভাব নিয়ে চলেননি তিনি কখনও।

চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্বরূপ সন্ধান ও কর্মের মূল্যবিচার জাতির কর্তব্য। এ কর্তব্য সাধনে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হয়।

জহুরুল হক বুলবুল : সহকারী অধ্যাপক, কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ, টাঙ্গাইল