তিতাস-ওয়াসার দুর্নীতি
jugantor
তিতাস-ওয়াসার দুর্নীতি
লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন

  সম্পাদকীয়  

১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৯ সালে তিতাস ও ওয়াসার ৩৩ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুঃখজনক হল, এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের গরজ দেখায়নি সেবাধর্মী এ দুই প্রতিষ্ঠান।
ফাইল ছবি

২০১৯ সালে তিতাস ও ওয়াসার ৩৩ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুঃখজনক হল, এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের গরজ দেখায়নি সেবাধর্মী এ দুই প্রতিষ্ঠান।

উল্লেখ্য, গত বছর দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম অনুসন্ধান চালিয়ে তিতাসে দুর্নীতির ২২ উৎস চিহ্নিত করে বলেছিল, তিতাসে গ্যাস সংযোগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না; অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো হয় ইত্যাদি।

এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে সে সময় ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। অন্যদিকে ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পসহ অন্তত ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই শতকোটি টাকার বিল তুলে নেয়া, অযৌক্তিক কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি।

ওয়াসার অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধেও ১২ দফা সুপারিশ করেছিল দুদক। প্রতিষ্ঠান দুটির দুর্নীতির খতিয়ান এবং তা বন্ধে সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পেশের পরও কেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল না- এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত।

সরকারি সেবা খাতে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম ও হয়রানির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে টিআইবি ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি সেবা সম্পর্কিত জাতীয় খানা জরিপ-২০১৭ প্রকাশ করেছিল; যেখানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন হয়েছে অন্তত ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।

একই বছর দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক ‘এনফোর্সমেন্ট’ অভিযানের আওতায় বিআরটিএ, পাসপোর্ট অধিদফতর, বিআরটিসি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), শিক্ষাভবন, বিভিন্ন হাসপাতাল, সিএজি, বিএসটিআই, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরসহ দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করেছিল।

অভিযানে তখন শিউরে ওঠার মতো দুর্নীতির চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছিল এবং তা বন্ধে যথারীতি সুপারিশও পেশ করা হয়েছিল। তবে তাতে অবস্থার যে কোনো পরিবর্তন হয়নি, এর প্রমাণ তিতাস ও ওয়াসার ফাইলবন্দি ২৪ সুপারিশ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোয় লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব করছে এবং এর ফলে প্রান্তিক ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী ক্ষতির শিকার হচ্ছে। মূলত দুর্নীতি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনে বড় বাধা।

মৌলিক অধিকার রক্ষায় সরকারের আন্তরিক ভূমিকা কাম্য হলেও উদ্বেগের বিষয় হল, এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান শক্ত কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নয়; দেশের সর্বত্র দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে লুটপাটের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার মূলোৎপাটন করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়-নীতিবোধ, সততা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে দুর্নীতির তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তিতাস-ওয়াসাসহ দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোয় দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মূলত লুটপাটের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এবং এটি রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

দারিদ্র্য বিমোচন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, গড় আয়ু বেড়ে ৭১.৬ বছর হওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মধ্যম আয়ের (উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যেতে অগ্রগতি অর্জন) দেশে পরিণত হওয়াসহ অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন আশাপ্রদ হলেও দুর্নীতির ব্যাপ্তি সবকিছু গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে, যা থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি।

তিতাস-ওয়াসার দুর্নীতি

লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন
 সম্পাদকীয় 
১০ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৯ সালে তিতাস ও ওয়াসার ৩৩ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুঃখজনক হল, এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের গরজ দেখায়নি সেবাধর্মী এ দুই প্রতিষ্ঠান।
ফাইল ছবি

২০১৯ সালে তিতাস ও ওয়াসার ৩৩ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুঃখজনক হল, এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের গরজ দেখায়নি সেবাধর্মী এ দুই প্রতিষ্ঠান।

উল্লেখ্য, গত বছর দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম অনুসন্ধান চালিয়ে তিতাসে দুর্নীতির ২২ উৎস চিহ্নিত করে বলেছিল, তিতাসে গ্যাস সংযোগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না; অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো হয় ইত্যাদি।

এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে সে সময় ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। অন্যদিকে ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পসহ অন্তত ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই শতকোটি টাকার বিল তুলে নেয়া, অযৌক্তিক কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি।

ওয়াসার অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধেও ১২ দফা সুপারিশ করেছিল দুদক। প্রতিষ্ঠান দুটির দুর্নীতির খতিয়ান এবং তা বন্ধে সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পেশের পরও কেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল না- এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত।

সরকারি সেবা খাতে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম ও হয়রানির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে টিআইবি ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি সেবা সম্পর্কিত জাতীয় খানা জরিপ-২০১৭ প্রকাশ করেছিল; যেখানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন হয়েছে অন্তত ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।

একই বছর দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক ‘এনফোর্সমেন্ট’ অভিযানের আওতায় বিআরটিএ, পাসপোর্ট অধিদফতর, বিআরটিসি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), শিক্ষাভবন, বিভিন্ন হাসপাতাল, সিএজি, বিএসটিআই, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরসহ দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করেছিল।

অভিযানে তখন শিউরে ওঠার মতো দুর্নীতির চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছিল এবং তা বন্ধে যথারীতি সুপারিশও পেশ করা হয়েছিল। তবে তাতে অবস্থার যে কোনো পরিবর্তন হয়নি, এর প্রমাণ তিতাস ও ওয়াসার ফাইলবন্দি ২৪ সুপারিশ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোয় লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব করছে এবং এর ফলে প্রান্তিক ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী ক্ষতির শিকার হচ্ছে। মূলত দুর্নীতি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনে বড় বাধা।

মৌলিক অধিকার রক্ষায় সরকারের আন্তরিক ভূমিকা কাম্য হলেও উদ্বেগের বিষয় হল, এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান শক্ত কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নয়; দেশের সর্বত্র দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে লুটপাটের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার মূলোৎপাটন করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়-নীতিবোধ, সততা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে দুর্নীতির তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তিতাস-ওয়াসাসহ দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোয় দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মূলত লুটপাটের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এবং এটি রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

দারিদ্র্য বিমোচন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, গড় আয়ু বেড়ে ৭১.৬ বছর হওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মধ্যম আয়ের (উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যেতে অগ্রগতি অর্জন) দেশে পরিণত হওয়াসহ অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন আশাপ্রদ হলেও দুর্নীতির ব্যাপ্তি সবকিছু গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে, যা থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি।