করোনা টিকার দৌড়ে কার কী অবস্থান
jugantor
করোনা টিকার দৌড়ে কার কী অবস্থান

  শুভাগত চৌধুরী  

১২ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার হানা সেই ডিসেম্বরে শুরু চীনে। এরপর ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে। মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা, লকডাউন- এগুলো করেও প্রাণঘাতী এ ভাইরাসকে পর্যুদস্ত করা যাচ্ছে না। দেশে করোনায় মৃত্যু সাড়ে ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মৃত্যু হার কম।

করোনা গ্রাসে বিশ্ব : প্রতিষেধকের সন্ধানে রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। খোঁজ চলছে টিকার। এ অনুসন্ধানে আছে ১৫৪টি টিকা আবিষ্কারের কাজ। বাংলাদেশও শামিল হয়েছে এ দৌড়ে। কিছু টিকার ট্রায়াল শুরু হয়েছে মানবদেহে। বেশ কয়েক ধাপ পেরোতে হয় বাজারে আসার আগে। কতটা লাগবে সময় তা নির্ভর করে প্রত্যেক প্রস্তুতির পর্যায়গুলোর সফল উত্তরণের ওপর। এর প্রথমটি হল প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। প্রাণীদেহে পরীক্ষা। ইঁদুর বা বানরের দেহে প্রয়োগ। পরীক্ষামূলকভাবে তাদের দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হল কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা। এটি শেষ হলে-

প্রথম পর্যায় : সেফটি ট্রায়াল। অল্পসংখ্যক ব্যক্তির দেহে প্রয়োগ। নজর করা হয় তাদের দেহে ভাইরাস ঠেকানোর ক্ষমতা সৃষ্টি হল কিনা। দেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ল কিনা তাও দেখা হয়। এতে ৩-৪ মাস লেগে যায়। সফল হলে দ্বিতীয় পর্যায়। এ ট্রায়াল পরিসীমা আরও বাড়ানো হয়। বাচ্চা, বয়স্ক, বিভিন্ন বয়সের নানা গ্রুপে ভাগ করে ১০০ রোগীর ওপর প্রতিষেধক প্রয়োগ করে দেখা হয়। এটি কতটা নিরাপদ, দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হল কিনা দেখতেই তিন মাসের মতো সময় তো লাগেই। এরপর তৃতীয় পর্যায়। একে বলে এফিকেসি ট্রায়াল। প্রতিষেধকের ‘ফলপ্রসূতা’ পরীক্ষা। হাজারজনের ওপর পরীক্ষা। তিন মাসের অপেক্ষা। কতজন সংক্রমিত, কতজন সুস্থ হলেন। এরপর চতুর্থ পর্যায়। এ ধাপের ফলাফল দেখে টিকা তৈরির ছাড়পত্র দেয় সেদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সন্তুষ্ট হলে তবে ছাড়পত্র।

জানুয়ারিতে ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ হল। মানবদেহে প্রতিষেধক ট্রায়াল মার্চে হল শুরু। বাংলাদেশে টিকা উদ্ভাবনের কথা বলছেন একদল গবেষক। জিন বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশের দু’জন অণুজীব বিজ্ঞানী।

চীন প্রতিষেধক তৈরিতে বেশ এগিয়েছে। তৃতীয় ধাপে আছে। ক্যানমহিনোর টিকা। উহান ইন্সটিটিউট, সিনোফার্ম এরা দ্বিতীয় ধাপে। তৃতীয় ধাপে রয়েছে সিনোজ্যাক। বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্তভাবে ট্রায়ালের কথা হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বি এ ট্রায়ালে থাকার কথা। সরকারি অনুমোদন পেলে শুরু হতে পারে।

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাস্ট্রোজেনিকার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নেমেছে টিকা বাজারে দেয়ার জন্য। নাম ছিল চ্যাড্রক্স ১- এখন অ্যাস্ট্রোজেনিকার সঙ্গে এসে নতুন নাম এজেডডি ১২২২। ভ্যাকসিনটি বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। আছে তৃতীয় ধাপে। আছে ইমপিরিয়াল কলেজ লন্ডন, দ্বিতীয় ধাপে। আমেরিকার মর্ডানা। তৃতীয় ধাপে। ইউরোপে জার্মানির বায়োএনস্টেক, ফাইজারের টিকা দ্বিতীয় পর্যায়ে। অস্ট্রেলিয়া খুব এগোতে পারেনি।

রাশিয়াও আছে দৌড়ে দ্বিতীয় ধাপে। ভারত দৌড়ে বেশ এগিয়ে। কোজ্যাক্সিন। দেশে তৈরি টিকা আগস্টের শেষে আসবে, বলা হচ্ছে। বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। তবে সব টিকা এক রকম হবে না।

কিছু টিকা জেনেটিক, এক বা একাধিক করোনাভাইরাসের জিন ব্যবহার করে তৈরি। এরা মানবদেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করে। ভাইরাস ভেক্টর প্রতিষেধক এমন টিকা। একটি ভাইরাসের মাধ্যমে কোষের ভেতর করোনাভাইরাসের জিন ঢোকানো, এরা প্রতিরোধ শক্তি পরীক্ষা করে। রয়েছে প্রোটিন বেসড টিকা। হোল ভাইরাস ভেক্সিন। রিপারপারসড ভ্যাকসিন। দৌড়ে আছেন অনেকেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আগামী বছরের গোড়ার দিকের আগে তা বাজারে আসবে না। আর বাজারে এলেও আমরা কবে পাব সব মানুষের জন্য, তা অজানা। এর পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, কূটচাল আছে। এসব সামলানোর কাজ সফল হলে তবে। তবে আশা, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই প্রাপ্তির বিষয় নিজে সামলালে আমরা দ্রুত সফল হব।

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী : চিকিৎসক

 

করোনা টিকার দৌড়ে কার কী অবস্থান

 শুভাগত চৌধুরী 
১২ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার হানা সেই ডিসেম্বরে শুরু চীনে। এরপর ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে। মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা, লকডাউন- এগুলো করেও প্রাণঘাতী এ ভাইরাসকে পর্যুদস্ত করা যাচ্ছে না। দেশে করোনায় মৃত্যু সাড়ে ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মৃত্যু হার কম।

করোনা গ্রাসে বিশ্ব : প্রতিষেধকের সন্ধানে রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। খোঁজ চলছে টিকার। এ অনুসন্ধানে আছে ১৫৪টি টিকা আবিষ্কারের কাজ। বাংলাদেশও শামিল হয়েছে এ দৌড়ে। কিছু টিকার ট্রায়াল শুরু হয়েছে মানবদেহে। বেশ কয়েক ধাপ পেরোতে হয় বাজারে আসার আগে। কতটা লাগবে সময় তা নির্ভর করে প্রত্যেক প্রস্তুতির পর্যায়গুলোর সফল উত্তরণের ওপর। এর প্রথমটি হল প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। প্রাণীদেহে পরীক্ষা। ইঁদুর বা বানরের দেহে প্রয়োগ। পরীক্ষামূলকভাবে তাদের দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হল কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা। এটি শেষ হলে-

প্রথম পর্যায় : সেফটি ট্রায়াল। অল্পসংখ্যক ব্যক্তির দেহে প্রয়োগ। নজর করা হয় তাদের দেহে ভাইরাস ঠেকানোর ক্ষমতা সৃষ্টি হল কিনা। দেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ল কিনা তাও দেখা হয়। এতে ৩-৪ মাস লেগে যায়। সফল হলে দ্বিতীয় পর্যায়। এ ট্রায়াল পরিসীমা আরও বাড়ানো হয়। বাচ্চা, বয়স্ক, বিভিন্ন বয়সের নানা গ্রুপে ভাগ করে ১০০ রোগীর ওপর প্রতিষেধক প্রয়োগ করে দেখা হয়। এটি কতটা নিরাপদ, দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হল কিনা দেখতেই তিন মাসের মতো সময় তো লাগেই। এরপর তৃতীয় পর্যায়। একে বলে এফিকেসি ট্রায়াল। প্রতিষেধকের ‘ফলপ্রসূতা’ পরীক্ষা। হাজারজনের ওপর পরীক্ষা। তিন মাসের অপেক্ষা। কতজন সংক্রমিত, কতজন সুস্থ হলেন। এরপর চতুর্থ পর্যায়। এ ধাপের ফলাফল দেখে টিকা তৈরির ছাড়পত্র দেয় সেদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সন্তুষ্ট হলে তবে ছাড়পত্র।

জানুয়ারিতে ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ হল। মানবদেহে প্রতিষেধক ট্রায়াল মার্চে হল শুরু। বাংলাদেশে টিকা উদ্ভাবনের কথা বলছেন একদল গবেষক। জিন বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশের দু’জন অণুজীব বিজ্ঞানী।

চীন প্রতিষেধক তৈরিতে বেশ এগিয়েছে। তৃতীয় ধাপে আছে। ক্যানমহিনোর টিকা। উহান ইন্সটিটিউট, সিনোফার্ম এরা দ্বিতীয় ধাপে। তৃতীয় ধাপে রয়েছে সিনোজ্যাক। বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্তভাবে ট্রায়ালের কথা হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বি এ ট্রায়ালে থাকার কথা। সরকারি অনুমোদন পেলে শুরু হতে পারে।

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাস্ট্রোজেনিকার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নেমেছে টিকা বাজারে দেয়ার জন্য। নাম ছিল চ্যাড্রক্স ১- এখন অ্যাস্ট্রোজেনিকার সঙ্গে এসে নতুন নাম এজেডডি ১২২২। ভ্যাকসিনটি বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। আছে তৃতীয় ধাপে। আছে ইমপিরিয়াল কলেজ লন্ডন, দ্বিতীয় ধাপে। আমেরিকার মর্ডানা। তৃতীয় ধাপে। ইউরোপে জার্মানির বায়োএনস্টেক, ফাইজারের টিকা দ্বিতীয় পর্যায়ে। অস্ট্রেলিয়া খুব এগোতে পারেনি।

রাশিয়াও আছে দৌড়ে দ্বিতীয় ধাপে। ভারত দৌড়ে বেশ এগিয়ে। কোজ্যাক্সিন। দেশে তৈরি টিকা আগস্টের শেষে আসবে, বলা হচ্ছে। বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। তবে সব টিকা এক রকম হবে না।

কিছু টিকা জেনেটিক, এক বা একাধিক করোনাভাইরাসের জিন ব্যবহার করে তৈরি। এরা মানবদেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করে। ভাইরাস ভেক্টর প্রতিষেধক এমন টিকা। একটি ভাইরাসের মাধ্যমে কোষের ভেতর করোনাভাইরাসের জিন ঢোকানো, এরা প্রতিরোধ শক্তি পরীক্ষা করে। রয়েছে প্রোটিন বেসড টিকা। হোল ভাইরাস ভেক্সিন। রিপারপারসড ভ্যাকসিন। দৌড়ে আছেন অনেকেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আগামী বছরের গোড়ার দিকের আগে তা বাজারে আসবে না। আর বাজারে এলেও আমরা কবে পাব সব মানুষের জন্য, তা অজানা। এর পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, কূটচাল আছে। এসব সামলানোর কাজ সফল হলে তবে। তবে আশা, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই প্রাপ্তির বিষয় নিজে সামলালে আমরা দ্রুত সফল হব।

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী : চিকিৎসক