প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয়
jugantor
প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয়

  শাহরীন তাবাসসুম  

১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতি বলতে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে ঘেরা এক অরণ্য, সাধারণভাবে আমরা যাকে বন বলে থাকি। একটি বনের মাঝে থাকে অসংখ্য জীববৈচিত্র্য।

নানা ধরনের পশু-পাখির অবাধ চলাফেরা, পাখির কিচিরমিচির, সবুজে আবৃত মনোরম এক পরিবেশ, যা আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় রেখে যাচ্ছে অসামান্য ভূমিকা।

আমাদের চোখে বন কেবলই এক মনোরম পরিবেশ হলেও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সরবরাহ আসে এসব বন থেকেই। এক আমাজন বন থেকে আসে পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ। এজন্য আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস।

কিন্তু আমরা মানবসমাজ বারবার উঠেপড়ে লাগি বন ধ্বংস করার জন্য। আমরা বুঝে, না বুঝে, হেলাফেলায় যে হারে বন ধ্বংস করছি, তার ফলে হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বন ধ্বংস করতে করতে আমরা যে কখন নিজেদের ধ্বংস করে ফেলছি, তা আমাদেরই অজানা রয়ে গেছে।

একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। আমাদের আছে মাত্র ১৭ শতাংশ। কোনোভাবে বনভূমি বাড়ানো যাচ্ছে না, বরং দিন দিন কমে যাচ্ছে বনের পরিসর। মানুষ হানা দিচ্ছে

প্রকৃতির দুর্গম অঞ্চলে। যে সুন্দরবন ছিল সুরক্ষিত, সেই বনও এখন মানুষের অধিক ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বন দেশের সবচেয়ে বড় বনভূমি। কিন্তু মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে কক্সবাজারের বিশাল বনভূমির ক্ষতি হয়েছে।

এর পাশাপাশি বনদস্যুরা চুরি করে গাছ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে। সরকারিভাবে এই দস্যুদের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু তারপরও কমানো যাচ্ছে না বন উজাড় করার প্রবণতা।

সরকারি হিসাবমতে দেশের বনাঞ্চলের ভূমি ১৭ শতাংশ হলেও জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা ২০১৮ সালের ৯ জুলাই এক প্রতিবেদনে (দ্য টেস্ট অফ গ্লোবাল ফরেস্ট ২০১৮) বলেছে, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি।

সিএফও ও ডব্লিউআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনভূমি উজাড় হওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৬০ শতাংশ ছিল এ এলাকায়।

গত ৭ বছরে তা কমে প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে। রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনের জন্য ২০১৮ সালের প্রায় ছয় মাসে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে নষ্ট হয়েছে প্রায় ৫ হাজার একর বনভূমি।

মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রকৃতির ওপর রাজত্ব করতে চেয়েছে। এ যেন মানবকুলের পৈশাচিক এক নেশা, যে খেলায় সব থেকে বড় ক্ষতি মানকুলেরই হয়। মানুষ ভুলে যায় প্রকৃতির প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে তাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

অবাধে পশু শিকার, মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা, নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট করে বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ, বনের গাছ কাটা ও বনের জমি দখল- এসব যেন মানুষের অভ্যাসে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিবিধি হারিয়ে ফেলছে।

আমরা ভুলে যাই, ডাইনোসরের মতো শক্তিশালী প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রকৃতির বিরূপ পরিবর্তনের ফলে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে।

তা না হলে টিকে থাকবে তেলাপোকার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী আর পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে মানবজাতি।

তাই পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সর্বোত্তম চেষ্টা করতে হবে যার যার

অবস্থান থেকে।

শাহরীন তাবাসসুম : শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয়

 শাহরীন তাবাসসুম 
১৪ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতি বলতে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে ঘেরা এক অরণ্য, সাধারণভাবে আমরা যাকে বন বলে থাকি। একটি বনের মাঝে থাকে অসংখ্য জীববৈচিত্র্য।

নানা ধরনের পশু-পাখির অবাধ চলাফেরা, পাখির কিচিরমিচির, সবুজে আবৃত মনোরম এক পরিবেশ, যা আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় রেখে যাচ্ছে অসামান্য ভূমিকা।

আমাদের চোখে বন কেবলই এক মনোরম পরিবেশ হলেও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সরবরাহ আসে এসব বন থেকেই। এক আমাজন বন থেকে আসে পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ। এজন্য আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস।

কিন্তু আমরা মানবসমাজ বারবার উঠেপড়ে লাগি বন ধ্বংস করার জন্য। আমরা বুঝে, না বুঝে, হেলাফেলায় যে হারে বন ধ্বংস করছি, তার ফলে হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বন ধ্বংস করতে করতে আমরা যে কখন নিজেদের ধ্বংস করে ফেলছি, তা আমাদেরই অজানা রয়ে গেছে।

একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। আমাদের আছে মাত্র ১৭ শতাংশ। কোনোভাবে বনভূমি বাড়ানো যাচ্ছে না, বরং দিন দিন কমে যাচ্ছে বনের পরিসর। মানুষ হানা দিচ্ছে

প্রকৃতির দুর্গম অঞ্চলে। যে সুন্দরবন ছিল সুরক্ষিত, সেই বনও এখন মানুষের অধিক ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বন দেশের সবচেয়ে বড় বনভূমি। কিন্তু মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে কক্সবাজারের বিশাল বনভূমির ক্ষতি হয়েছে।

এর পাশাপাশি বনদস্যুরা চুরি করে গাছ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে। সরকারিভাবে এই দস্যুদের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু তারপরও কমানো যাচ্ছে না বন উজাড় করার প্রবণতা।

সরকারি হিসাবমতে দেশের বনাঞ্চলের ভূমি ১৭ শতাংশ হলেও জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা ২০১৮ সালের ৯ জুলাই এক প্রতিবেদনে (দ্য টেস্ট অফ গ্লোবাল ফরেস্ট ২০১৮) বলেছে, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি।

সিএফও ও ডব্লিউআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনভূমি উজাড় হওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৬০ শতাংশ ছিল এ এলাকায়।

গত ৭ বছরে তা কমে প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে। রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনের জন্য ২০১৮ সালের প্রায় ছয় মাসে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে নষ্ট হয়েছে প্রায় ৫ হাজার একর বনভূমি।

মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রকৃতির ওপর রাজত্ব করতে চেয়েছে। এ যেন মানবকুলের পৈশাচিক এক নেশা, যে খেলায় সব থেকে বড় ক্ষতি মানকুলেরই হয়। মানুষ ভুলে যায় প্রকৃতির প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে তাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

অবাধে পশু শিকার, মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা, নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট করে বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ, বনের গাছ কাটা ও বনের জমি দখল- এসব যেন মানুষের অভ্যাসে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিবিধি হারিয়ে ফেলছে।

আমরা ভুলে যাই, ডাইনোসরের মতো শক্তিশালী প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রকৃতির বিরূপ পরিবর্তনের ফলে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে।

তা না হলে টিকে থাকবে তেলাপোকার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী আর পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে মানবজাতি।

তাই পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সর্বোত্তম চেষ্টা করতে হবে যার যার

অবস্থান থেকে।

শাহরীন তাবাসসুম : শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ