টিআইবির প্রতিবেদন
jugantor
টিআইবির প্রতিবেদন
লুটেরাদের হাত থেকে ব্যাংক খাতকে মুক্ত করতে হবে

  সম্পাদকীয়  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ব্যাংকিং খাত তদারকি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দেশের ব্যাংক খাতে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবাধ বিচরণ বাড়ছে।

সবকিছু নিয়ন্ত্রণে এ চক্রটি পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছে এবং তাদের এ সিন্ডিকেটের কাছে সবাই জিম্মি হয়ে পড়ায় গত এক দশকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০০ শতাংশের উপরে। বিপুল অঙ্কের এ খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক অকার্যকর হয়ে পড়েছে- এ কথা উল্লেখ করে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুস্থ ও নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করাসহ ২২ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

দেশে এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ খাতে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, লুটপাট ও দুর্নীতির ঘটনাও বেড়ে চলেছে। এ নৈরাজ্যের অবসান ঘটাতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক পরিচালকরা ভাগাভাগির মাধ্যমে নিজের ও অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন, যার অধিকাংশই আর ফেরত আসছে না। এর ফলে মন্দ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।

এ কথা সর্বজনবিদিত, অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও পরিচালক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরাও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পান। এর ফলে তাদের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব অনেকটাই শিথিল। এ সুযোগে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তারা নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্ম দিচ্ছেন।

বস্তুত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা কিছু মানুষের দুর্নীতি দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে গ্রাস করে ফেলছে এবং এর ফলে খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। আশঙ্কার বিষয় হল, আজকাল পরিচালকরা ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না; পাশাপাশি সিএসআরের (কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় সামাজিক দায়বদ্ধতা) টাকায়ও ভাগ বসাচ্ছেন। এছাড়া ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ঋণ মঞ্জুর, সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রেও নানা সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ব্যাংক পরিচালকদের বিরুদ্ধে, যা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা উচিত।

আশার কথা, সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কেবল কমিশন গঠন করলেই হবে না, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও থাকতে হবে কমিশনের। স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা না থাকলে যেসব লক্ষ্য নিয়ে কমিশন গঠিত হবে, তা ভেস্তে যাবে। অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং এর ফল যে ভালো হবে না তা নিশ্চিত।

এতে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের কাজটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ প্রেক্ষাপটে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত লুটেরা চক্রের হাত থেকে ব্যাংকিং খাতকে মুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণসহ টিআইবির সুপারিশগুলো সরকার আমলে নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

টিআইবির প্রতিবেদন

লুটেরাদের হাত থেকে ব্যাংক খাতকে মুক্ত করতে হবে
 সম্পাদকীয় 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ব্যাংকিং খাত তদারকি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দেশের ব্যাংক খাতে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবাধ বিচরণ বাড়ছে।

সবকিছু নিয়ন্ত্রণে এ চক্রটি পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছে এবং তাদের এ সিন্ডিকেটের কাছে সবাই জিম্মি হয়ে পড়ায় গত এক দশকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০০ শতাংশের উপরে। বিপুল অঙ্কের এ খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক অকার্যকর হয়ে পড়েছে- এ কথা উল্লেখ করে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুস্থ ও নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করাসহ ২২ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

দেশে এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ খাতে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, লুটপাট ও দুর্নীতির ঘটনাও বেড়ে চলেছে। এ নৈরাজ্যের অবসান ঘটাতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক পরিচালকরা ভাগাভাগির মাধ্যমে নিজের ও অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন, যার অধিকাংশই আর ফেরত আসছে না। এর ফলে মন্দ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।

এ কথা সর্বজনবিদিত, অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও পরিচালক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরাও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পান। এর ফলে তাদের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব অনেকটাই শিথিল। এ সুযোগে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তারা নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্ম দিচ্ছেন।

বস্তুত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা কিছু মানুষের দুর্নীতি দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে গ্রাস করে ফেলছে এবং এর ফলে খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। আশঙ্কার বিষয় হল, আজকাল পরিচালকরা ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না; পাশাপাশি সিএসআরের (কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় সামাজিক দায়বদ্ধতা) টাকায়ও ভাগ বসাচ্ছেন। এছাড়া ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ঋণ মঞ্জুর, সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রেও নানা সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ব্যাংক পরিচালকদের বিরুদ্ধে, যা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা উচিত।

আশার কথা, সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কেবল কমিশন গঠন করলেই হবে না, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও থাকতে হবে কমিশনের। স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা না থাকলে যেসব লক্ষ্য নিয়ে কমিশন গঠিত হবে, তা ভেস্তে যাবে। অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং এর ফল যে ভালো হবে না তা নিশ্চিত।

এতে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের কাজটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ প্রেক্ষাপটে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত লুটেরা চক্রের হাত থেকে ব্যাংকিং খাতকে মুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণসহ টিআইবির সুপারিশগুলো সরকার আমলে নেবে, এটাই প্রত্যাশা।