আমাদের বীরকন্যা
jugantor
আমাদের বীরকন্যা

  প্রীতি রাহা  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন একজন সাহসী বিপ্লবী নারী। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন প্রীতিলতা। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন।

পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে তিনি দর্শনে স্নাতক পাস করেন। সে বছরেই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং নন্দনকানন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপরেই তিনি বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যোগ দেন মাস্টারদা সূর্যসেনের দলে।

স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা হন প্রথম নারী বিপ্লবী। তিনি যখন বিপ্লবী দলের সদস্য হতে চেয়েছিলেন তখন মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন পলাতক। ১৯৩২ সালের মে মাসে মাস্টারদার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় প্রীতিলতার। মাস্টারদা সূর্যসেন প্রীতিলতার দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ অভিযানের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন।

সে সময়ের কিছু কথা উল্লেখ করছি। তখন দলের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছে। অভিযান সফল করার লক্ষ্যে তাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আট সদস্যবিশিষ্ট এ দলের দলপতি করা হয় প্রীতিলতাকে। অভিযান শুরু করা হয় ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, রাত ১০টায়।

বিপ্লবীদের এ অভিযান সফল হয়েছিল। নিয়মানুসারে সামরিক কায়দায় আক্রমণের সময় নেতা থাকবে সবার আগে এবং ফেরার পথে সাথীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নেতা ফিরবে সবার পরে। এ নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন প্রীতিলতা। অভিযান সফল হওয়ার পর হুইসেল বাজিয়ে সদস্যদের ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। পরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি নিজেও। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ সৈনিকের গুলিতে আহত হন তিনি।

ইতোমধ্যে দলের অন্যান্য সদস্য নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়েছেন। দলের সব সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই প্রীতিলতা তার সঙ্গে বহন করা ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ পান করে আত্মাহুতির পথ বেছে নেন। উল্লেখ্য, আগে থেকেই নির্দেশ দেয়া ছিল, বিপ্লবী সদস্যদের কোনোভাবেই শত্রুর হাতে জীবিত ধরা দেয়া যাবে না। আহত অবস্থায় যাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রীতিলতাকে বন্দি করতে না পারে সে জন্য তিনি পূর্ব নির্দেশের প্রতি অবিচল থেকে বিষপান করে আত্মাহুতি দেন।

তিনি প্রমাণ করে গেছেন মাস্টারদার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। প্রীতিলতা এ অভিযানের যোগ্য নেতৃত্বদানকারী ছিলেন। পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ব্রিটিশ পুলিশ প্রীতিলতার মৃতদেহ খুঁজে পায়। একজন নারীকে আক্রমণকারী হিসেবে শনাক্ত করে তারা হতভম্ব হয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মৃত্যুর পর তার শেষ বিবৃতি (চিঠি) তার পকেটে পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়েছে যে, আমার দেশের বোনেরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সহস্র বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করে এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করবেন- এই আশা নিয়ে আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হলাম।’

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে জানাই লাল সালাম।

প্রীতি রাহা : প্রাবন্ধিক

[email protected]

আমাদের বীরকন্যা

 প্রীতি রাহা 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন একজন সাহসী বিপ্লবী নারী। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন প্রীতিলতা। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন।

পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে তিনি দর্শনে স্নাতক পাস করেন। সে বছরেই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং নন্দনকানন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপরেই তিনি বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যোগ দেন মাস্টারদা সূর্যসেনের দলে।

স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা হন প্রথম নারী বিপ্লবী। তিনি যখন বিপ্লবী দলের সদস্য হতে চেয়েছিলেন তখন মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন পলাতক। ১৯৩২ সালের মে মাসে মাস্টারদার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় প্রীতিলতার। মাস্টারদা সূর্যসেন প্রীতিলতার দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ অভিযানের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন।

সে সময়ের কিছু কথা উল্লেখ করছি। তখন দলের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছে। অভিযান সফল করার লক্ষ্যে তাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আট সদস্যবিশিষ্ট এ দলের দলপতি করা হয় প্রীতিলতাকে। অভিযান শুরু করা হয় ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, রাত ১০টায়।

বিপ্লবীদের এ অভিযান সফল হয়েছিল। নিয়মানুসারে সামরিক কায়দায় আক্রমণের সময় নেতা থাকবে সবার আগে এবং ফেরার পথে সাথীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নেতা ফিরবে সবার পরে। এ নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন প্রীতিলতা। অভিযান সফল হওয়ার পর হুইসেল বাজিয়ে সদস্যদের ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। পরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি নিজেও। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ সৈনিকের গুলিতে আহত হন তিনি।

ইতোমধ্যে দলের অন্যান্য সদস্য নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়েছেন। দলের সব সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই প্রীতিলতা তার সঙ্গে বহন করা ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ পান করে আত্মাহুতির পথ বেছে নেন। উল্লেখ্য, আগে থেকেই নির্দেশ দেয়া ছিল, বিপ্লবী সদস্যদের কোনোভাবেই শত্রুর হাতে জীবিত ধরা দেয়া যাবে না। আহত অবস্থায় যাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রীতিলতাকে বন্দি করতে না পারে সে জন্য তিনি পূর্ব নির্দেশের প্রতি অবিচল থেকে বিষপান করে আত্মাহুতি দেন।

তিনি প্রমাণ করে গেছেন মাস্টারদার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। প্রীতিলতা এ অভিযানের যোগ্য নেতৃত্বদানকারী ছিলেন। পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ব্রিটিশ পুলিশ প্রীতিলতার মৃতদেহ খুঁজে পায়। একজন নারীকে আক্রমণকারী হিসেবে শনাক্ত করে তারা হতভম্ব হয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মৃত্যুর পর তার শেষ বিবৃতি (চিঠি) তার পকেটে পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়েছে যে, আমার দেশের বোনেরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সহস্র বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করে এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করবেন- এই আশা নিয়ে আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হলাম।’

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে জানাই লাল সালাম।

প্রীতি রাহা : প্রাবন্ধিক

[email protected]