মিয়ানমারের মিথ্যাচার, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চুপ কেন?
jugantor
মিয়ানমারের মিথ্যাচার, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চুপ কেন?

  সম্পাদকীয়  

০২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সম্পর্কে মিয়ানমারের মিথ্যাচার শুধু অনভিপ্রেতই নয়; একইসঙ্গে নিন্দনীয়।

বাংলাদেশ অবশ্য এরই মধ্যে মিয়ানমারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে কড়া জবাব দিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মিয়ানমারের নির্জলা মিথ্যাচার ও বানোয়াট বক্তব্য সত্যের অপলাপ মাত্র।

জাতিসংঘে রাখাইন রাজ্যের ঘটনা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য কেবল সাজানোই নয়; বরং পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। মিয়ানমার ভালো করেই জানে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং অন্য যে কোনো সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে।

তারপরও মিয়ানমারের এরকম মিথ্যাচারের কারণ একটাই- তারা রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে আগ্রহী নয়। ভুলে গেলে চলবে না, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি হয়েছে মিয়ানমারেই এবং এর সমাধানও তাদেরই করতে হবে।

প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশ মূলত ‘ভিকটিম’ হয়েছে। ইতোমধ্যে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ সংলাপের মাধ্যমে এ সংকট নিরসনের জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছে, এমনকি বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক, মিয়ানমার সেই চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক না হয়ে উল্টো রাখাইনে সংঘটিত গণহত্যাকে আড়াল করার জন্য প্রকৃত ঘটনা বিকৃতসহ মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে, যা কোনোমতেই মেনে নেয়া যায় না।

বস্তুত, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা গণহত্যার শামিল। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের চার সেনাসদস্য স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়েই অভিযানে নেমেছিল দেশটির সেনাবাহিনী।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়টির ওপর চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন। নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণ ছাড়াও বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানো হয়। বর্বরোচিত নির্যাতনের ফলে ওই সময় সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

গত কয়েক দশকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের মিলে বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ১১ লাখ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দীর্ঘসূত্রতা ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য যে বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুশাসন ও আইনি পদক্ষেপ। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এটি সহজেই বোধগম্য, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে বিপদ মাথায় নিয়ে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরতে চাইবে না। ফিরে গেলেও পুনরায় নিগৃহীত ও হামলার শিকার হলে তারা আবারও এ দেশে পালিয়ে আসবে। কাজেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার পাশাপাশি সেদেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ তৈরির নিশ্চয়তাও মিয়ানমারকে দিতে হবে।

এজন্য রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যাচার বন্ধ করে এসব বিষয়ে মিয়ানমার যাতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়, সে জন্য দেশটির ওপর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বৃদ্ধি করা উচিত।

মিয়ানমারের মিথ্যাচার, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চুপ কেন?

 সম্পাদকীয় 
০২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সম্পর্কে মিয়ানমারের মিথ্যাচার শুধু অনভিপ্রেতই নয়; একইসঙ্গে নিন্দনীয়।

বাংলাদেশ অবশ্য এরই মধ্যে মিয়ানমারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে কড়া জবাব দিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মিয়ানমারের নির্জলা মিথ্যাচার ও বানোয়াট বক্তব্য সত্যের অপলাপ মাত্র।

জাতিসংঘে রাখাইন রাজ্যের ঘটনা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য কেবল সাজানোই নয়; বরং পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। মিয়ানমার ভালো করেই জানে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং অন্য যে কোনো সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে।

তারপরও মিয়ানমারের এরকম মিথ্যাচারের কারণ একটাই- তারা রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে আগ্রহী নয়। ভুলে গেলে চলবে না, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি হয়েছে মিয়ানমারেই এবং এর সমাধানও তাদেরই করতে হবে।

প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশ মূলত ‘ভিকটিম’ হয়েছে। ইতোমধ্যে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ সংলাপের মাধ্যমে এ সংকট নিরসনের জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছে, এমনকি বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক, মিয়ানমার সেই চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক না হয়ে উল্টো রাখাইনে সংঘটিত গণহত্যাকে আড়াল করার জন্য প্রকৃত ঘটনা বিকৃতসহ মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে, যা কোনোমতেই মেনে নেয়া যায় না।

বস্তুত, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা গণহত্যার শামিল। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের চার সেনাসদস্য স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়েই অভিযানে নেমেছিল দেশটির সেনাবাহিনী।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়টির ওপর চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন। নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণ ছাড়াও বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানো হয়। বর্বরোচিত নির্যাতনের ফলে ওই সময় সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

গত কয়েক দশকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের মিলে বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ১১ লাখ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দীর্ঘসূত্রতা ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য যে বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুশাসন ও আইনি পদক্ষেপ। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এটি সহজেই বোধগম্য, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে বিপদ মাথায় নিয়ে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরতে চাইবে না। ফিরে গেলেও পুনরায় নিগৃহীত ও হামলার শিকার হলে তারা আবারও এ দেশে পালিয়ে আসবে। কাজেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার পাশাপাশি সেদেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ তৈরির নিশ্চয়তাও মিয়ানমারকে দিতে হবে।

এজন্য রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যাচার বন্ধ করে এসব বিষয়ে মিয়ানমার যাতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়, সে জন্য দেশটির ওপর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বৃদ্ধি করা উচিত।