ভয়ংকর সামাজিক অবক্ষয়ের নাম ধর্ষণ
jugantor
ভয়ংকর সামাজিক অবক্ষয়ের নাম ধর্ষণ

  মাজহার মান্নান  

০২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সহজাতভাবে দুটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এর একটি হল তার ভালো দিক, যেটাকে বলে বুদ্ধিবৃত্তি। অন্যটি হল মন্দ দিক, যেটাকে বলে জৈববৃত্তি। সামাজিক অনুশাসন, শিক্ষা, আইন, বিচার ও শৃঙ্খলাবোধ মানুষের এই জৈববৃত্তি বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে। মানুষের মাঝে যে পশুত্ব আছে সেটাকে দমন করার জন্য ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু দায়িত্ব আছে। এ দায়িত্বে যখন ঘাটতি থাকে তখন শুরু হয় পশুবৃত্তির আগ্রাসন। দেশে বর্তমানে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ মহামারীর রূপ ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে জঘন্য সব ঘটনা। কোনো নারীই যেন এ থেকে আজ নিরাপদ নয়। গত ৬ মাসে দেশে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে নির্মমতার শিকার হয়েছে ৬০১ জন নারী ও শিশু। একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন। দলবদ্ধ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৩৪ জন। এর মধ্যে ১০৩ জন শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৩৭ জন নারী। ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে ১২৬ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চলতি বছরের ছয় মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হল, বারবার কেন এ ধরনের পাশবিক ঘটনা ঘটছে? বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক তরুণ আজ মাদকে আসক্ত। এই আসক্তি তাদের নানা অপকর্মে লিপ্ত করছে। ধর্ষণ এর একটি। আকাশ সংস্কৃতি আজ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হানছে। এর ফলে যুবসমাজ ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। সামাজিক অনুশাসন বড় ভূমিকা পালন করে তরুণদের সুপথে রাখতে। কিন্তু কোথায় আজ সেই সামাজিক অনুশাসন? কীটে খাওয়া দগ্ধ লাশের চেহারা আজ সামাজিক অনুশাসনের। ধর্মীয় অনুশাসন অনেক বড় ভূমিকা রাখে তরুণদের সঠিক পথে রাখতে। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা শিশুদের নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত করে। একটি শিশু কিভাবে বড় হচ্ছে, কোন আদর্শ সে নিজের মধ্যে ধারণ করছে এসব দেখার দায়িত্ব পরিবার, প্রতিবেশী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ জায়গাগুলোতেও আজ অবহেলা ও অদূরদর্শিতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

এবার আসি বিচার প্রসঙ্গে। অন্যায়ের বিচার না হলে সেই অন্যায় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যায়ের পথকে সুগম করে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে কোনোমতেই ঠুনকোভাবে নেয়া উচিত নয়। এ অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে পারলে তা নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে এবং অন্যদের জন্য সেটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ দূর করতে কতগুলো পদক্ষেপ অতি জরুরি- ১. কঠোর শাস্তি, ২. সামাজিক অনুশাসন, ৩. ধর্মীয় শিক্ষা, ৪. মাদক দূরীকরণ, ৫. বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি, ৬. নিজের সংস্কৃতি সমৃদ্ধকরণ, ৭. পারিবারিক বন্ধন, ৮. সামাজিক আন্দোলন, ৯. তরুণদের খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, ১০. কিশোর অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

ধর্ষণের মতো অপরাধপ্রবণতা কোনো একক প্রচেষ্টায় সমাধান হবে না। এর জন্য দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা। যুবকদের আত্মিক উন্নতি সাধনে বড়দের বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। পারিবারিক বন্ধন মজবুত না হলে সেই পরিবারের সন্তানদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আসুন আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি যার যার অবস্থান থেকে। একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে আসলে তেমন কোনো লাভ হয় না। একটি সর্বাত্মক প্রচেষ্টাই পারে যে কোনো অপরাধ উপড়ে ফেলতে।

মাজহার মান্নান : সহকারী অধ্যাপক, বিএএফ শাহীন কলেজ, ঢাকা

ভয়ংকর সামাজিক অবক্ষয়ের নাম ধর্ষণ

 মাজহার মান্নান 
০২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সহজাতভাবে দুটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এর একটি হল তার ভালো দিক, যেটাকে বলে বুদ্ধিবৃত্তি। অন্যটি হল মন্দ দিক, যেটাকে বলে জৈববৃত্তি। সামাজিক অনুশাসন, শিক্ষা, আইন, বিচার ও শৃঙ্খলাবোধ মানুষের এই জৈববৃত্তি বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে। মানুষের মাঝে যে পশুত্ব আছে সেটাকে দমন করার জন্য ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু দায়িত্ব আছে। এ দায়িত্বে যখন ঘাটতি থাকে তখন শুরু হয় পশুবৃত্তির আগ্রাসন। দেশে বর্তমানে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ মহামারীর রূপ ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে জঘন্য সব ঘটনা। কোনো নারীই যেন এ থেকে আজ নিরাপদ নয়। গত ৬ মাসে দেশে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে নির্মমতার শিকার হয়েছে ৬০১ জন নারী ও শিশু। একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন। দলবদ্ধ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৩৪ জন। এর মধ্যে ১০৩ জন শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৩৭ জন নারী। ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে ১২৬ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চলতি বছরের ছয় মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হল, বারবার কেন এ ধরনের পাশবিক ঘটনা ঘটছে? বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক তরুণ আজ মাদকে আসক্ত। এই আসক্তি তাদের নানা অপকর্মে লিপ্ত করছে। ধর্ষণ এর একটি। আকাশ সংস্কৃতি আজ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হানছে। এর ফলে যুবসমাজ ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। সামাজিক অনুশাসন বড় ভূমিকা পালন করে তরুণদের সুপথে রাখতে। কিন্তু কোথায় আজ সেই সামাজিক অনুশাসন? কীটে খাওয়া দগ্ধ লাশের চেহারা আজ সামাজিক অনুশাসনের। ধর্মীয় অনুশাসন অনেক বড় ভূমিকা রাখে তরুণদের সঠিক পথে রাখতে। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা শিশুদের নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত করে। একটি শিশু কিভাবে বড় হচ্ছে, কোন আদর্শ সে নিজের মধ্যে ধারণ করছে এসব দেখার দায়িত্ব পরিবার, প্রতিবেশী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ জায়গাগুলোতেও আজ অবহেলা ও অদূরদর্শিতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

এবার আসি বিচার প্রসঙ্গে। অন্যায়ের বিচার না হলে সেই অন্যায় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যায়ের পথকে সুগম করে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে কোনোমতেই ঠুনকোভাবে নেয়া উচিত নয়। এ অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে পারলে তা নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে এবং অন্যদের জন্য সেটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ দূর করতে কতগুলো পদক্ষেপ অতি জরুরি- ১. কঠোর শাস্তি, ২. সামাজিক অনুশাসন, ৩. ধর্মীয় শিক্ষা, ৪. মাদক দূরীকরণ, ৫. বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি, ৬. নিজের সংস্কৃতি সমৃদ্ধকরণ, ৭. পারিবারিক বন্ধন, ৮. সামাজিক আন্দোলন, ৯. তরুণদের খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, ১০. কিশোর অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

ধর্ষণের মতো অপরাধপ্রবণতা কোনো একক প্রচেষ্টায় সমাধান হবে না। এর জন্য দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা। যুবকদের আত্মিক উন্নতি সাধনে বড়দের বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। পারিবারিক বন্ধন মজবুত না হলে সেই পরিবারের সন্তানদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আসুন আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি যার যার অবস্থান থেকে। একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে আসলে তেমন কোনো লাভ হয় না। একটি সর্বাত্মক প্রচেষ্টাই পারে যে কোনো অপরাধ উপড়ে ফেলতে।

মাজহার মান্নান : সহকারী অধ্যাপক, বিএএফ শাহীন কলেজ, ঢাকা