আর কোনো শিশুকে যেন এভাবে প্রাণ দিতে না হয়
jugantor
আর কোনো শিশুকে যেন এভাবে প্রাণ দিতে না হয়

  মো. সিদ্দিকুর রহমান  

১৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ঢাকায় অবস্থানরত তার পরিবারের সব সদস্যকে হত্যা করে। বাদ পড়েনি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলও। শিশু রাসেল সেই ভয়ঙ্কর সময়ে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছিল সেন্টিপোস্টের পেছনে। পরিবারের সবাইকে হত্যা করে খুনিরা খুঁজতে থাকে তাকে। খুঁজতে খুঁজতে একসময় পেয়েও যায়।

ভয় পেয়ে রাসেল কাঁদতে থাকে আর বলে, ‘আমাকে মেরো না, আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাও।’ শিশু রাসেল তখনও জানত না ঘাতকরা তার পরিবারের উপস্থিত সবাইকে মেরে ফেলেছে। সশস্ত্র ঘাতক তাকে বলে, চল তোর মায়ের কাছে। বলে টানতে টানতে নিয়ে যায় দোতলায়। বাবা-মায়ের রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে চমকে ওঠে আর কাঁদতে থাকে রাসেল। নিষ্ঠুর ঘাতকের দল মায়ের কাছে নিয়ে শিশু রাসেলকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেয়। তার নিথর শরীর আছড়ে পড়ে মায়ের শরীরে। এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

বেদনা ও দুঃখের স্মৃতি ভেসে আসে শিশু রাসেলের কথা মনে হলে। প্রতিদিন শিশুহত্যা, শিশু নির্যাতনের খবর দেখে ভাবি, মানুষরূপী নরপিশাচরা কেন কঠোর যন্ত্রণাময় শাস্তি পায় না? ছোট্ট শিশু রাসেলের তো বেঁচে থাকার কথা। এ অবুঝ শিশুটি কী অন্যায় করেছিল? রাসেলের বেঁচে থাকার আকুতি কি বাংলার আকাশ-বাতাসকে আন্দোলিত করেনি? কেন ঘাতকদের হৃদয়ে শিশুর প্রতি ভালোবাসার স্থান হয়নি? আজ শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাসেলের প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে। সব শিশুর জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর ওপর মাত্রাতিরিক্ত বই-খাতার বোঝা কমাতে হাইকোর্টের রায়ের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নীরব। মাত্রাতিরিক্ত বই-খাতা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূলে বই, শিশুদের জন্য উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়নসহ শিশুদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ১ম থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষার পরিবর্তে মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। পরীক্ষা ব্যবস্থা, বাড়িতে পড়ার চাপ আমাদের দেশে আদিকাল থেকেই চলে আসছে। বাড়িতে শিশুরা পড়াশোনা করবে না- আমাদের দেশের শিক্ষক ও অভিভাবকরা একথা যেন ভাবতেও পারেন না!

উন্নত বিশ্বের আদলে বিদ্যালয়ই হোক শিক্ষার কেন্দ্র, জ্ঞান অর্জন হোক শিক্ষার লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক সংকট সর্বাগ্রে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। সব শিশুর জন্য অভিন্ন কর্মঘণ্টা, বই, মূল্যায়ন ব্যবস্থা কাম্য। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের মতো শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধার জন্য আমলাতান্ত্রিক মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

বিবেকবান জনতা, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকসহ সর্বস্তরের মানুষ শেখ রাসেলের কথা স্মরণ করে এ দেশের শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করুক। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর কোনো শিশুই যেন অত্যাচার ও বঞ্চনার শিকার না হয়। অসহায়ত্বের মাঝে যেন তাদের পড়তে না হয়।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

আর কোনো শিশুকে যেন এভাবে প্রাণ দিতে না হয়

 মো. সিদ্দিকুর রহমান 
১৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ঢাকায় অবস্থানরত তার পরিবারের সব সদস্যকে হত্যা করে। বাদ পড়েনি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলও। শিশু রাসেল সেই ভয়ঙ্কর সময়ে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছিল সেন্টিপোস্টের পেছনে। পরিবারের সবাইকে হত্যা করে খুনিরা খুঁজতে থাকে তাকে। খুঁজতে খুঁজতে একসময় পেয়েও যায়।

ভয় পেয়ে রাসেল কাঁদতে থাকে আর বলে, ‘আমাকে মেরো না, আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাও।’ শিশু রাসেল তখনও জানত না ঘাতকরা তার পরিবারের উপস্থিত সবাইকে মেরে ফেলেছে। সশস্ত্র ঘাতক তাকে বলে, চল তোর মায়ের কাছে। বলে টানতে টানতে নিয়ে যায় দোতলায়। বাবা-মায়ের রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে চমকে ওঠে আর কাঁদতে থাকে রাসেল। নিষ্ঠুর ঘাতকের দল মায়ের কাছে নিয়ে শিশু রাসেলকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেয়। তার নিথর শরীর আছড়ে পড়ে মায়ের শরীরে। এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

বেদনা ও দুঃখের স্মৃতি ভেসে আসে শিশু রাসেলের কথা মনে হলে। প্রতিদিন শিশুহত্যা, শিশু নির্যাতনের খবর দেখে ভাবি, মানুষরূপী নরপিশাচরা কেন কঠোর যন্ত্রণাময় শাস্তি পায় না? ছোট্ট শিশু রাসেলের তো বেঁচে থাকার কথা। এ অবুঝ শিশুটি কী অন্যায় করেছিল? রাসেলের বেঁচে থাকার আকুতি কি বাংলার আকাশ-বাতাসকে আন্দোলিত করেনি? কেন ঘাতকদের হৃদয়ে শিশুর প্রতি ভালোবাসার স্থান হয়নি? আজ শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাসেলের প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে। সব শিশুর জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর ওপর মাত্রাতিরিক্ত বই-খাতার বোঝা কমাতে হাইকোর্টের রায়ের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নীরব। মাত্রাতিরিক্ত বই-খাতা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূলে বই, শিশুদের জন্য উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়নসহ শিশুদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ১ম থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষার পরিবর্তে মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। পরীক্ষা ব্যবস্থা, বাড়িতে পড়ার চাপ আমাদের দেশে আদিকাল থেকেই চলে আসছে। বাড়িতে শিশুরা পড়াশোনা করবে না- আমাদের দেশের শিক্ষক ও অভিভাবকরা একথা যেন ভাবতেও পারেন না!

উন্নত বিশ্বের আদলে বিদ্যালয়ই হোক শিক্ষার কেন্দ্র, জ্ঞান অর্জন হোক শিক্ষার লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক সংকট সর্বাগ্রে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। সব শিশুর জন্য অভিন্ন কর্মঘণ্টা, বই, মূল্যায়ন ব্যবস্থা কাম্য। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের মতো শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধার জন্য আমলাতান্ত্রিক মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

বিবেকবান জনতা, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকসহ সর্বস্তরের মানুষ শেখ রাসেলের কথা স্মরণ করে এ দেশের শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করুক। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর কোনো শিশুই যেন অত্যাচার ও বঞ্চনার শিকার না হয়। অসহায়ত্বের মাঝে যেন তাদের পড়তে না হয়।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ