জাতিসংঘের সংস্কার প্রয়োজন
jugantor
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
জাতিসংঘের সংস্কার প্রয়োজন

  মোহাম্মদ সালাউদ্দিন  

২৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের জন্ম ও বিকাশ ছিল গত শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কারণে বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের জন্ম হলেও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সংস্থাটি কতটুকু সফল হয়েছে, তা এক বড় প্রশ্ন। বিভিন্ন কারণে মনে করা হচ্ছে, একুশ শতকে জাতিসংঘের একটি বড় ভূমিকা থাকবে। তবে জাতিসংঘের ভূমিকা বুঝতে হলে ১৯৪৫ সাল-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতি বুঝতে হবে।

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে মাত্র ৫০টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতিসংঘের। আজ এর সদস্য সংখ্যা ১৯৩। প্রতিষ্ঠানটি তার জন্মের ৭৫ বছর পার করছে এ বছর। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব করার প্রবণতা রোধ করার ব্যর্থতা একুশ শতকে জাতিসংঘের ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বলতে দ্বিধা নেই, উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ ক্ষমতাধর পাঁচটি দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থেই জাতিসংঘকে টিকিয়ে রেখেছে।

জাতিসংঘ যে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না, এ অভিযোগ অনেক পুরনো। তবে বিশ্বসংস্থার সাফল্য যে একেবারে নেই, তা বলা যাবে না, যদিও ব্যর্থতার পাল্লাই ভারি। সম্প্রতি হাজার হাজার সিরিয়া ও ইরাকি শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করে এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে; জাতিসংঘ এ সমস্যার সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাক দখল করে নিয়েছিল এবং সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করেছিল, যা ছিল জাতিসংঘ সনদের বরখেলাপ। ২০১১ সালে ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’- এই অভিযোগ তুলে লিবিয়ায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ হামলায় গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং লিবিয়া এখন কার্যত অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একই অভিযোগ উঠেছে সিরিয়ার ক্ষেত্রেও।

শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি; বরং এ ক্ষেত্রে সংস্থাটি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেয়নি কোনো ব্যবস্থা।

জাতিসংঘের রীতি অনুযায়ী যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে ৫ সদস্যরাষ্ট্রের যে কোনো একটি কোনো কারণে দ্বিমত পোষণ করে বিপক্ষে ভোট দিলে (ভেটো) সে বিষয়ে আর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। জাতিসংঘকে একটি প্রকৃত কার্যকর সংস্থায় পরিণত করতে হলে এ রীতির সংশোধন ও সংস্কার হওয়া জরুরি।

বস্তুত জাতিসংঘ যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে বা এ সংস্থাকে যেভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে, তাতে স্থায়ী ৫ সদস্যরাষ্ট্র ছাড়া আর কারও স্বার্থ রক্ষা পায় না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভেটো ক্ষমতার সংস্কার হলে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষা পেতে পারে।

কোনো রাষ্ট্রের ওপর যেন কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া না হয় বা কোনো রাষ্ট্র যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে জাতিসংঘকে দৃষ্টি দিতে হবে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার প্রয়াস যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবেই জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। বিশ্বে ফিরে আসবে শান্তি।

মোহাম্মদ সালাউদ্দিন : প্রাবন্ধিক

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

জাতিসংঘের সংস্কার প্রয়োজন

 মোহাম্মদ সালাউদ্দিন 
২৪ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের জন্ম ও বিকাশ ছিল গত শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কারণে বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের জন্ম হলেও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সংস্থাটি কতটুকু সফল হয়েছে, তা এক বড় প্রশ্ন। বিভিন্ন কারণে মনে করা হচ্ছে, একুশ শতকে জাতিসংঘের একটি বড় ভূমিকা থাকবে। তবে জাতিসংঘের ভূমিকা বুঝতে হলে ১৯৪৫ সাল-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতি বুঝতে হবে।

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে মাত্র ৫০টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতিসংঘের। আজ এর সদস্য সংখ্যা ১৯৩। প্রতিষ্ঠানটি তার জন্মের ৭৫ বছর পার করছে এ বছর। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব করার প্রবণতা রোধ করার ব্যর্থতা একুশ শতকে জাতিসংঘের ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বলতে দ্বিধা নেই, উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ ক্ষমতাধর পাঁচটি দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থেই জাতিসংঘকে টিকিয়ে রেখেছে।

জাতিসংঘ যে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না, এ অভিযোগ অনেক পুরনো। তবে বিশ্বসংস্থার সাফল্য যে একেবারে নেই, তা বলা যাবে না, যদিও ব্যর্থতার পাল্লাই ভারি। সম্প্রতি হাজার হাজার সিরিয়া ও ইরাকি শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করে এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে; জাতিসংঘ এ সমস্যার সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাক দখল করে নিয়েছিল এবং সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করেছিল, যা ছিল জাতিসংঘ সনদের বরখেলাপ। ২০১১ সালে ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’- এই অভিযোগ তুলে লিবিয়ায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ হামলায় গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং লিবিয়া এখন কার্যত অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একই অভিযোগ উঠেছে সিরিয়ার ক্ষেত্রেও।

শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি; বরং এ ক্ষেত্রে সংস্থাটি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেয়নি কোনো ব্যবস্থা।

জাতিসংঘের রীতি অনুযায়ী যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে ৫ সদস্যরাষ্ট্রের যে কোনো একটি কোনো কারণে দ্বিমত পোষণ করে বিপক্ষে ভোট দিলে (ভেটো) সে বিষয়ে আর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। জাতিসংঘকে একটি প্রকৃত কার্যকর সংস্থায় পরিণত করতে হলে এ রীতির সংশোধন ও সংস্কার হওয়া জরুরি।

বস্তুত জাতিসংঘ যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে বা এ সংস্থাকে যেভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে, তাতে স্থায়ী ৫ সদস্যরাষ্ট্র ছাড়া আর কারও স্বার্থ রক্ষা পায় না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভেটো ক্ষমতার সংস্কার হলে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষা পেতে পারে।

কোনো রাষ্ট্রের ওপর যেন কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া না হয় বা কোনো রাষ্ট্র যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে জাতিসংঘকে দৃষ্টি দিতে হবে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার প্রয়াস যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবেই জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। বিশ্বে ফিরে আসবে শান্তি।

মোহাম্মদ সালাউদ্দিন : প্রাবন্ধিক