‘কিরে, দেখতে আসবি না?’
jugantor
‘কিরে, দেখতে আসবি না?’

  রুমিন ফারহানা  

২৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যারিস্টার রফিক উল হকের মৃত্যু সংবাদ নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। এই রাষ্ট্রের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া একজন মানুষ, বহু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করা মানুষটির মৃত্যু দেশটাকে শোকে আচ্ছন্ন করে দেবে, এটাই স্বাভাবিক। তার মৃত্যুতে আমার ব্যক্তিগত শোক রাষ্ট্রের এমন একজন আইকনকে হারানোর শোক নয়, তার চাইতে বহুগুণ বেশি- একজন পিতা, শিক্ষাগুরু, পরম আত্মীয়কে হারানোর শোক। গত কয়েকদিন থেকে তিনি যখন আইসিইউতে আছেন, তখন থেকেই ভেতরে এক অজানা আশঙ্কা কাজ করছিল। আজ সকালে যখন আশঙ্কাটা সত্যি হওয়ার ভয়ংকর সংবাদটি পেলাম, তখন তীব্র শোকে ভেতরটা আচ্ছন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠেছে তার সঙ্গে কাটানো স্মৃতি, কত স্মৃতি!

মনে পড়ে সেই প্রথম দিনটার কথা, যেদিন স্যার জুনিয়র হিসেবে আমাকে গ্রহণ করার পর আমি তার চেম্বারে গিয়েছিলাম। আমাকে এক কোণে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কোনোরকম যোগাযোগ তিনি আমার সঙ্গে করেননি, নিজে কথা বলা দূরে থাকুক। প্রায় এক মাস পর আমাকে তিনি প্রথম কাজ দেন। একটি মানহানি মামলায় একজন বিখ্যাত মানুষের পক্ষে একটি ড্রাফট লেখার জন্য। লিখে দিলাম সেটি। প্রথম কাজটি তার এতই পছন্দ হয় যে তিনি এই ড্রাফট তার সঙ্গে কাজ করা সব আইনজীবীকে দেখিয়েছিলেন। আপাদমস্তক একজন প্রফেশনাল মানুষ রফিক স্যারের সঙ্গে কাজের সূত্রে তৈরি হওয়া সম্পর্ক পরে পায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপ্তি। দেশের এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় স্যারের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি আমি। সে সময় দেখেছি এই একজন মানুষ কীভাবে একটা প্রবল পরাক্রমশালী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমার বাবা অলি আহাদ প্রথম কোনো রাজনীতিবিদ হিসেবে ওয়ান-ইলেভেনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়ায় বাবার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ ছিলেন স্যার। বাবা অসুস্থ হলে প্রথমেই দেখতে আসেন তিনি, মৃত্যুর সময়ও তাই।

সেই সময়ে নানা কারণে অভিযুক্ত দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ বিভিন্ন দেশে ছিলেন বলে তাদের মামলার ব্যাপারে কাজ করার জন্য বিভিন্ন দেশে, যেমন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারত গিয়েছিলাম তার সঙ্গে।

স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রতিটি ঈদে প্রথমে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে সালাম না করলে আমার ঈদ শুরু হতো না। সঙ্গে থাকত তার বাবুর্চির হাতের রান্না অসাধারণ সেমাই-পায়েস আর অবশ্যই ফুচকা। ফুচকা ছিল স্যারের প্রিয় খাবার, মাঝে মাঝে তিনিই বাসায় সেটা বানিয়ে জুনিয়রদের নিয়ে খেতেন। আজ মনে পড়ছে তার প্রচণ্ড রকম বকা খাওয়ার কথা। দূর থেকে দেখলে যে কারও কাছে তাকে একজন যাচ্ছেতাই বদমেজাজি মানুষ বলে মনে হবে। কিন্তু তার কাছে থেকে দেখেছি কী অবিশ্বাস্য রকম একজন নরম মনের ভীষণ আবেগী মানুষ ছিলেন তিনি।

তার উইট ছিল অসাধারণ। মনে পড়ছে একবার সিঙ্গাপুরে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় ফুটপাত একটু উঁচু-নিচু দেখে তার নিরাপত্তার কথা ভেবে তার হাত ধরে হাঁটছিলাম। সেদিন কেন যেন তার হাতটা বেশ ঠাণ্ডা ছিল। বলেছিলাম, স্যার হাত এত ঠাণ্ডা কেন? চটপট জবাব তার- মাথাটা অনেক বেশি গরম, তাই হাত এত ঠাণ্ডা। সময় কেটে যায়, প্রত্যেকেরই তার মতো ব্যস্ততা তৈরি হয়। এক সময় স্যারের চেম্বার থেকে অন্য চেম্বারে যাই, তারপর এক সময় রাজনীতির চাপে প্র্যাকটিস থেকেই অনেকটা সরে আসি। কিন্তু স্যারের সঙ্গে যোগাযোগটা রয়ে গিয়েছিল, ফোনে এবং সরাসরি। মনে পড়ে এমপি হওয়ার পর স্যারকে সালাম করতে গিয়েছিলাম। কী অসাধারণ খুশি হয়েছিলেন তিনি সেদিন!

আগেই বলেছিলাম, স্যারের বাসায় বসা চাঁদের হাট আস্তে আস্তে ভেঙে গিয়েছিল বেশকিছু বছর আগেই। এক সময় তিনি ভীষণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করে তাকে দেখতে যেতে বলতেন। শেষবার স্যারকে দেখে আসার পর কেটে গেছে বেশকিছু দিন। স্যার চলে যাওয়ার পর বারবারই মনে হচ্ছে আর কখনও কেউ ওই মায়া জড়ানো কণ্ঠে বলবে না- ‘কিরে, দেখতে আসবি না?’

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য

‘কিরে, দেখতে আসবি না?’

 রুমিন ফারহানা 
২৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যারিস্টার রফিক উল হকের মৃত্যু সংবাদ নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। এই রাষ্ট্রের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া একজন মানুষ, বহু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করা মানুষটির মৃত্যু দেশটাকে শোকে আচ্ছন্ন করে দেবে, এটাই স্বাভাবিক। তার মৃত্যুতে আমার ব্যক্তিগত শোক রাষ্ট্রের এমন একজন আইকনকে হারানোর শোক নয়, তার চাইতে বহুগুণ বেশি- একজন পিতা, শিক্ষাগুরু, পরম আত্মীয়কে হারানোর শোক। গত কয়েকদিন থেকে তিনি যখন আইসিইউতে আছেন, তখন থেকেই ভেতরে এক অজানা আশঙ্কা কাজ করছিল। আজ সকালে যখন আশঙ্কাটা সত্যি হওয়ার ভয়ংকর সংবাদটি পেলাম, তখন তীব্র শোকে ভেতরটা আচ্ছন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠেছে তার সঙ্গে কাটানো স্মৃতি, কত স্মৃতি!

মনে পড়ে সেই প্রথম দিনটার কথা, যেদিন স্যার জুনিয়র হিসেবে আমাকে গ্রহণ করার পর আমি তার চেম্বারে গিয়েছিলাম। আমাকে এক কোণে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কোনোরকম যোগাযোগ তিনি আমার সঙ্গে করেননি, নিজে কথা বলা দূরে থাকুক। প্রায় এক মাস পর আমাকে তিনি প্রথম কাজ দেন। একটি মানহানি মামলায় একজন বিখ্যাত মানুষের পক্ষে একটি ড্রাফট লেখার জন্য। লিখে দিলাম সেটি। প্রথম কাজটি তার এতই পছন্দ হয় যে তিনি এই ড্রাফট তার সঙ্গে কাজ করা সব আইনজীবীকে দেখিয়েছিলেন। আপাদমস্তক একজন প্রফেশনাল মানুষ রফিক স্যারের সঙ্গে কাজের সূত্রে তৈরি হওয়া সম্পর্ক পরে পায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপ্তি। দেশের এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় স্যারের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি আমি। সে সময় দেখেছি এই একজন মানুষ কীভাবে একটা প্রবল পরাক্রমশালী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমার বাবা অলি আহাদ প্রথম কোনো রাজনীতিবিদ হিসেবে ওয়ান-ইলেভেনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়ায় বাবার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ ছিলেন স্যার। বাবা অসুস্থ হলে প্রথমেই দেখতে আসেন তিনি, মৃত্যুর সময়ও তাই।

সেই সময়ে নানা কারণে অভিযুক্ত দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ বিভিন্ন দেশে ছিলেন বলে তাদের মামলার ব্যাপারে কাজ করার জন্য বিভিন্ন দেশে, যেমন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারত গিয়েছিলাম তার সঙ্গে।

স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রতিটি ঈদে প্রথমে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে সালাম না করলে আমার ঈদ শুরু হতো না। সঙ্গে থাকত তার বাবুর্চির হাতের রান্না অসাধারণ সেমাই-পায়েস আর অবশ্যই ফুচকা। ফুচকা ছিল স্যারের প্রিয় খাবার, মাঝে মাঝে তিনিই বাসায় সেটা বানিয়ে জুনিয়রদের নিয়ে খেতেন। আজ মনে পড়ছে তার প্রচণ্ড রকম বকা খাওয়ার কথা। দূর থেকে দেখলে যে কারও কাছে তাকে একজন যাচ্ছেতাই বদমেজাজি মানুষ বলে মনে হবে। কিন্তু তার কাছে থেকে দেখেছি কী অবিশ্বাস্য রকম একজন নরম মনের ভীষণ আবেগী মানুষ ছিলেন তিনি।

তার উইট ছিল অসাধারণ। মনে পড়ছে একবার সিঙ্গাপুরে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় ফুটপাত একটু উঁচু-নিচু দেখে তার নিরাপত্তার কথা ভেবে তার হাত ধরে হাঁটছিলাম। সেদিন কেন যেন তার হাতটা বেশ ঠাণ্ডা ছিল। বলেছিলাম, স্যার হাত এত ঠাণ্ডা কেন? চটপট জবাব তার- মাথাটা অনেক বেশি গরম, তাই হাত এত ঠাণ্ডা। সময় কেটে যায়, প্রত্যেকেরই তার মতো ব্যস্ততা তৈরি হয়। এক সময় স্যারের চেম্বার থেকে অন্য চেম্বারে যাই, তারপর এক সময় রাজনীতির চাপে প্র্যাকটিস থেকেই অনেকটা সরে আসি। কিন্তু স্যারের সঙ্গে যোগাযোগটা রয়ে গিয়েছিল, ফোনে এবং সরাসরি। মনে পড়ে এমপি হওয়ার পর স্যারকে সালাম করতে গিয়েছিলাম। কী অসাধারণ খুশি হয়েছিলেন তিনি সেদিন!

আগেই বলেছিলাম, স্যারের বাসায় বসা চাঁদের হাট আস্তে আস্তে ভেঙে গিয়েছিল বেশকিছু বছর আগেই। এক সময় তিনি ভীষণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করে তাকে দেখতে যেতে বলতেন। শেষবার স্যারকে দেখে আসার পর কেটে গেছে বেশকিছু দিন। স্যার চলে যাওয়ার পর বারবারই মনে হচ্ছে আর কখনও কেউ ওই মায়া জড়ানো কণ্ঠে বলবে না- ‘কিরে, দেখতে আসবি না?’

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য