রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বৃদ্ধি: প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই রয়েছে সংকটের সমাধান
jugantor
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বৃদ্ধি: প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই রয়েছে সংকটের সমাধান

  সম্পাদকীয়  

২১ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অপরাধের মাত্রা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগজনক। কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই অর্থ লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রশাসনের অগোচরে ক্যাম্পগুলোয় বিভিন্ন ধরনের কমিটি করছে তারা। ফলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। আমরা আশা করব, এ কমিটির সঠিক দিকনির্দেশনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাসহ রোহিঙ্গাদের সব ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব হবে।

নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই বাংলাদেশের জন্য মূর্তিমান সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হল, এ সংকট তিন বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে পদার্পণ করলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনোরকম অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না; বরং আশ্রয় শিবিরগুলোকে তারা বিভিন্ন অপরাধের আখড়ায় পরিণত করেছে। জানা গেছে, প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ৩৪টি আশ্রয় শিবির নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৩২টি সন্ত্রাসী দল ও উপদল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গত এক বছরে নিহত হয়েছে ৪৬ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। ২০১৭ সালে মামলা হয়েছে ৭৬টি, যেখানে আসামির সংখ্যা ছিল কয়েকশ’। ২০১৮ সালে ২০৮টি মামলায় আসামি করা হয় ৪১৪ জনকে। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ২৬৩ আর আসামি ৬৪৯ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০০ মামলা হয়েছে; যেসব মামলায় আসামির সংখ্যা অন্তত ৫০০।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হলে সংখ্যালঘু এ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাত লাখেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে কয়েক দশকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় আর্থ-সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ গিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে এবং এর দায়ভার বর্তাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাসস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। সরকার ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের একাংশকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে উন্নত বাসস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ স্বকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মধ্যেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের জরুরি সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে বুধবার বিপুল ভোটে চতুর্থবারের মতো রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে, যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে- বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান রয়েছে। উল্লেখ্য, ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে এ রেজুলেশন উত্থাপন করেছে, যাতে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে ১০৪টি দেশ। এ রেজুলেশনের আলোকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গঠনমূলক একটি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর নতুনভাবে চাপ সৃষ্টি করবে, এটাই প্রত্যশা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বৃদ্ধি: প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই রয়েছে সংকটের সমাধান

 সম্পাদকীয় 
২১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
রোহিঙ্গা ক্যাম্প
ফাইল ছবি

আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অপরাধের মাত্রা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগজনক। কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই অর্থ লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রশাসনের অগোচরে ক্যাম্পগুলোয় বিভিন্ন ধরনের কমিটি করছে তারা। ফলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। আমরা আশা করব, এ কমিটির সঠিক দিকনির্দেশনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাসহ রোহিঙ্গাদের সব ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব হবে।

নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই বাংলাদেশের জন্য মূর্তিমান সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হল, এ সংকট তিন বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে পদার্পণ করলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনোরকম অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না; বরং আশ্রয় শিবিরগুলোকে তারা বিভিন্ন অপরাধের আখড়ায় পরিণত করেছে। জানা গেছে, প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ৩৪টি আশ্রয় শিবির নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৩২টি সন্ত্রাসী দল ও উপদল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গত এক বছরে নিহত হয়েছে ৪৬ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। ২০১৭ সালে মামলা হয়েছে ৭৬টি, যেখানে আসামির সংখ্যা ছিল কয়েকশ’। ২০১৮ সালে ২০৮টি মামলায় আসামি করা হয় ৪১৪ জনকে। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ২৬৩ আর আসামি ৬৪৯ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০০ মামলা হয়েছে; যেসব মামলায় আসামির সংখ্যা অন্তত ৫০০।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হলে সংখ্যালঘু এ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাত লাখেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে কয়েক দশকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় আর্থ-সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ গিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে এবং এর দায়ভার বর্তাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাসস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। সরকার ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের একাংশকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে উন্নত বাসস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ স্বকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মধ্যেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের জরুরি সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে বুধবার বিপুল ভোটে চতুর্থবারের মতো রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে, যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে- বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান রয়েছে। উল্লেখ্য, ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে এ রেজুলেশন উত্থাপন করেছে, যাতে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে ১০৪টি দেশ। এ রেজুলেশনের আলোকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গঠনমূলক একটি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর নতুনভাবে চাপ সৃষ্টি করবে, এটাই প্রত্যশা।

 

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা