ম্যারাডোনার মহাপ্রয়াণ
jugantor
ম্যারাডোনার মহাপ্রয়াণ
ফুটবল ইতিহাসে তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন

  সম্পাদকীয়  

২৭ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার আকস্মিক মৃত্যুতে সারা বিশ্বের ফুটবল অনুরাগীর মতো বাংলাদেশের মানুষও ব্যথিত।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে তার এ প্রয়াণকে অকালমৃত্যুই বলতে হয়। ম্যারাডোনা ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাকে মৃত্যুর পরও যুগে যুগে মানুষ স্মরণ করবে তার জাদুকরী খেলার জন্য।

একটা সময় ছিল, যখন ফুটবল সম্রাট বলতে একটি নামই সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। সেই নামটি হল ‘পেলে’।

ম্যারাডোনার আবির্ভাবের পর পেলের শ্রেষ্ঠত্বের সেই একচ্ছত্র ‘রাজত্ব’ আর থাকেনি। আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে পেলে ও ম্যারাডোনা- দুটি নামই পাশাপাশি স্থান পায়। দুজনের মধ্যে কে সেরা, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে একটি বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই- জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ম্যারাডোনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার এত বছর পরও ম্যারাডোনা সারা বিশ্বে আবালবৃদ্ধবনিতার প্রিয় একটি নাম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও জাদুকরী খেলার মাধ্যমে সারা বিশ্বকে মাতিয়ে দিয়েছিলেন বলেই হয়তো তিনি সাধারণ মানুষের কাছে এত প্রিয়।

কিংবা তার সরলতা, স্পষ্টবাদিতা এবং কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের কারণে। ফিফা যখন শ্রেষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা দুটি নামকে বিবেচনায় রেখেছিল- খেলায় বিধি-নিয়মের প্রতি অত্যধিক নিষ্ঠার জন্য পেলে এবং জনগণের পছন্দের জন্য ম্যারাডোনা।

তবে শুধু জনপ্রিয়তার কারণেই নয়, খেলার নৈপুণ্যের দিক থেকেও তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার একেকটি গোল বারবার দেখার মতো। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ম্যারাডোনার মতো তার গোলগুলোও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বস্তুত ম্যারাডোনা ফুটবলকে অনুপম শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার বহুল আলোচিত গোলটির কথা সবার মনে থাকার কথা, যাকে তিনি বলেছিলেন ‘ঈশ্বরের হাতের গোল’। এ গোলের কারণে ভক্তদের অস্বস্তিদায়ক অনুভূতি সত্ত্বেও একই খেলায় ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোলটিকে সাধারণ মানুষ বিশ্বকাপের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত করেছিল।

ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষ। ম্যারাডোনার জীবনেও কিছু নেতিবাচক ঘটনা রয়েছে। এক সময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ইতালিতে মাফিয়াচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। তবে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন তিনি।

রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও ম্যারাডোনার রাজনৈতিক ভাবনা ছিল বেশ স্পষ্ট। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের বিষয়ে ছিলেন তীব্র সমালোচনামুখর। চে গুয়েভারা ছিল তার আদর্শ। ফিদেল কাস্ত্রো প্রিয় ব্যক্তিত্ব। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ম্যারাডোনাকে সেদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশেও ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তা বিপুল। মূলত তার কারণেই এ দেশের বিপুলসংখ্যক ফুটবলপ্রেমী বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছেন।

ম্যারাডোনার আত্মজীবনী ‘এল দিয়েগো’ গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণের মুখবন্ধে অনুবাদক লিখেছেন, ‘তাকে (ম্যারাডোনা) যখন ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন আমি একটি ঘটনা নিয়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন্য গবেষণার সময় জানতে পারি, ম্যারাডোনাকে বহিষ্কারের ঘটনায় বাংলাদেশের কয়েকশ’ মানুষ গণআত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।’

ম্যারাডোনার মৃত্যু হলেও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অন্তত যতদিন ফুটবল খেলার প্রচলন থাকবে, ততদিন ক্রীড়ানুরাগীরা ম্যারাডোনাকে মনে রাখবেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে।

ম্যারাডোনার মহাপ্রয়াণ

ফুটবল ইতিহাসে তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন
 সম্পাদকীয় 
২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার আকস্মিক মৃত্যুতে সারা বিশ্বের ফুটবল অনুরাগীর মতো বাংলাদেশের মানুষও ব্যথিত।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে তার এ প্রয়াণকে অকালমৃত্যুই বলতে হয়। ম্যারাডোনা ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাকে মৃত্যুর পরও যুগে যুগে মানুষ স্মরণ করবে তার জাদুকরী খেলার জন্য।

একটা সময় ছিল, যখন ফুটবল সম্রাট বলতে একটি নামই সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। সেই নামটি হল ‘পেলে’।

ম্যারাডোনার আবির্ভাবের পর পেলের শ্রেষ্ঠত্বের সেই একচ্ছত্র ‘রাজত্ব’ আর থাকেনি। আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে পেলে ও ম্যারাডোনা- দুটি নামই পাশাপাশি স্থান পায়। দুজনের মধ্যে কে সেরা, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে একটি বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই- জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ম্যারাডোনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার এত বছর পরও ম্যারাডোনা সারা বিশ্বে আবালবৃদ্ধবনিতার প্রিয় একটি নাম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও জাদুকরী খেলার মাধ্যমে সারা বিশ্বকে মাতিয়ে দিয়েছিলেন বলেই হয়তো তিনি সাধারণ মানুষের কাছে এত প্রিয়।

কিংবা তার সরলতা, স্পষ্টবাদিতা এবং কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের কারণে। ফিফা যখন শ্রেষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা দুটি নামকে বিবেচনায় রেখেছিল- খেলায় বিধি-নিয়মের প্রতি অত্যধিক নিষ্ঠার জন্য পেলে এবং জনগণের পছন্দের জন্য ম্যারাডোনা।

তবে শুধু জনপ্রিয়তার কারণেই নয়, খেলার নৈপুণ্যের দিক থেকেও তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার একেকটি গোল বারবার দেখার মতো। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ম্যারাডোনার মতো তার গোলগুলোও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বস্তুত ম্যারাডোনা ফুটবলকে অনুপম শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার বহুল আলোচিত গোলটির কথা সবার মনে থাকার কথা, যাকে তিনি বলেছিলেন ‘ঈশ্বরের হাতের গোল’। এ গোলের কারণে ভক্তদের অস্বস্তিদায়ক অনুভূতি সত্ত্বেও একই খেলায় ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোলটিকে সাধারণ মানুষ বিশ্বকাপের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত করেছিল।

ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষ। ম্যারাডোনার জীবনেও কিছু নেতিবাচক ঘটনা রয়েছে। এক সময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ইতালিতে মাফিয়াচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। তবে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন তিনি।

রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও ম্যারাডোনার রাজনৈতিক ভাবনা ছিল বেশ স্পষ্ট। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের বিষয়ে ছিলেন তীব্র সমালোচনামুখর। চে গুয়েভারা ছিল তার আদর্শ। ফিদেল কাস্ত্রো প্রিয় ব্যক্তিত্ব। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ম্যারাডোনাকে সেদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশেও ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তা বিপুল। মূলত তার কারণেই এ দেশের বিপুলসংখ্যক ফুটবলপ্রেমী বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছেন।

ম্যারাডোনার আত্মজীবনী ‘এল দিয়েগো’ গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণের মুখবন্ধে অনুবাদক লিখেছেন, ‘তাকে (ম্যারাডোনা) যখন ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন আমি একটি ঘটনা নিয়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন্য গবেষণার সময় জানতে পারি, ম্যারাডোনাকে বহিষ্কারের ঘটনায় বাংলাদেশের কয়েকশ’ মানুষ গণআত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।’

ম্যারাডোনার মৃত্যু হলেও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অন্তত যতদিন ফুটবল খেলার প্রচলন থাকবে, ততদিন ক্রীড়ানুরাগীরা ম্যারাডোনাকে মনে রাখবেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে।