একজন নগরপিতার প্রতিকৃতি
jugantor
স্মরণ
একজন নগরপিতার প্রতিকৃতি

  হাবিবুল ইসলাম সুমন  

২৮ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ হানিফ ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহভাজন মোহাম্মদ হানিফ ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন।

তার আমলে ঢাকার উন্নয়নে রাস্তাঘাট, নর্দমা, ফুটপাত, নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে রোড ডিভাইডার, আন্ডারপাস, সেতু, ফুটওভারব্রিজ, নারীদের মাতৃত্বকালীন পরিচর্যার জন্য নগরীতে বেশ কয়েকটি মাতৃসদন, ঢাকার সৌন্দর্য বাড়ানো ও নগরবাসীর চাহিদা পূরণে নগরীতে বিজলিবাতি ও ফোয়ারা, পুরান ঢাকার আউটফলে ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, নারী শিক্ষার বিস্তারে লক্ষ্মীবাজারে ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ, শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য পৌর শিশু পার্ক ইত্যাদি নির্মিত হয়।

ঢাকা মহানগরীর উন্নয়নে তার আরও অনেক অবদান রয়েছে। মোহাম্মদ হানিফ ১৯৪৪ সালের ১ এপ্রিল পুরান ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যৌবনের শুরু থেকে সারা জীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকেছেন। দলীয় রাজনীতি করলেও মোহাম্মদ হানিফের উদার চিন্তা-চেতনা ও সংবেদনশীল মনোভাবের কারণে দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে অত্যন্ত সফলতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছেন। তিনি একান্ত সচিব থাকাকালীন ছয় দফা আন্দোলনের প্রস্তুতি, ছয় দফা মুক্তিসনদ প্রণয়ন ও প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিসংগ্রামে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সব আন্দোলনে তিনি রাজপথে প্রথম কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া ঢাকা-১২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী সময়ে হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে মোহাম্মদ হানিফ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্র্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছেন। ’৯০-এর গণআন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মোহাম্মদ হানিফ।

২০০৪ সালের ভয়াল ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের ট্রাকমঞ্চে বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নারকীয় গ্রেনেড হামলার সময় নিজের জীবন তুচ্ছ করে মানবঢাল রচনা করে তাকে রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন মোহাম্মদ হানিফ। ওই ঘটনায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও মোহাম্মদ হানিফ মারাত্মকভাবে আহত হন। তার মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য স্পি­ন্টার ঢুকে পড়ে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায়ও কোনো ফল হয়নি। মাথার গভীরে বিঁধে থাকায় তা অস্ত্রোপচার করেও অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। সেই দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেই রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয় থেকেছেন মোহাম্মদ হানিফ।

২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশে সভাপতি হিসেবে বক্তৃতা দেয়ার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। মাথায় বিদ্ধ স্পি­ন্টারের কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় ২৮ নভেম্বর দিবাগত রাতে ৬২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মোহাম্মদ হানিফ। চির অবসান ঘটে তার কর্মময় বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের। আজ তার চতুর্দশ মৃত্যুবার্ষিকী।

মোহাম্মদ হানিফ চলে গেছেন জাতির এক দুঃসময়ে। তার মতো আদর্শনিষ্ঠ, অকুতোভয় ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের বড় বেশি প্রয়োজন আজ। তার মৃত্যুতে সৃষ্ট শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। দেশের রাজনীতিতে তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। একজন সফল রাজনীতিক ও সফল মেয়র হিসেবে মোহাম্মদ হানিফ আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

হাবিবুল ইসলাম সুমন : জনসংযোগ কর্মকর্তা, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মেমেরিয়াল ফাউন্ডেশন

স্মরণ

একজন নগরপিতার প্রতিকৃতি

 হাবিবুল ইসলাম সুমন 
২৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ হানিফ ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহভাজন মোহাম্মদ হানিফ ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন।

তার আমলে ঢাকার উন্নয়নে রাস্তাঘাট, নর্দমা, ফুটপাত, নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে রোড ডিভাইডার, আন্ডারপাস, সেতু, ফুটওভারব্রিজ, নারীদের মাতৃত্বকালীন পরিচর্যার জন্য নগরীতে বেশ কয়েকটি মাতৃসদন, ঢাকার সৌন্দর্য বাড়ানো ও নগরবাসীর চাহিদা পূরণে নগরীতে বিজলিবাতি ও ফোয়ারা, পুরান ঢাকার আউটফলে ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, নারী শিক্ষার বিস্তারে লক্ষ্মীবাজারে ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ, শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য পৌর শিশু পার্ক ইত্যাদি নির্মিত হয়।

ঢাকা মহানগরীর উন্নয়নে তার আরও অনেক অবদান রয়েছে। মোহাম্মদ হানিফ ১৯৪৪ সালের ১ এপ্রিল পুরান ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যৌবনের শুরু থেকে সারা জীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকেছেন। দলীয় রাজনীতি করলেও মোহাম্মদ হানিফের উদার চিন্তা-চেতনা ও সংবেদনশীল মনোভাবের কারণে দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে অত্যন্ত সফলতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছেন। তিনি একান্ত সচিব থাকাকালীন ছয় দফা আন্দোলনের প্রস্তুতি, ছয় দফা মুক্তিসনদ প্রণয়ন ও প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিসংগ্রামে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সব আন্দোলনে তিনি রাজপথে প্রথম কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া ঢাকা-১২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী সময়ে হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে মোহাম্মদ হানিফ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্র্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছেন। ’৯০-এর গণআন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মোহাম্মদ হানিফ।

২০০৪ সালের ভয়াল ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের ট্রাকমঞ্চে বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নারকীয় গ্রেনেড হামলার সময় নিজের জীবন তুচ্ছ করে মানবঢাল রচনা করে তাকে রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন মোহাম্মদ হানিফ। ওই ঘটনায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও মোহাম্মদ হানিফ মারাত্মকভাবে আহত হন। তার মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য স্পি­ন্টার ঢুকে পড়ে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায়ও কোনো ফল হয়নি। মাথার গভীরে বিঁধে থাকায় তা অস্ত্রোপচার করেও অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। সেই দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেই রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয় থেকেছেন মোহাম্মদ হানিফ।

২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশে সভাপতি হিসেবে বক্তৃতা দেয়ার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। মাথায় বিদ্ধ স্পি­ন্টারের কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় ২৮ নভেম্বর দিবাগত রাতে ৬২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মোহাম্মদ হানিফ। চির অবসান ঘটে তার কর্মময় বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের। আজ তার চতুর্দশ মৃত্যুবার্ষিকী।

মোহাম্মদ হানিফ চলে গেছেন জাতির এক দুঃসময়ে। তার মতো আদর্শনিষ্ঠ, অকুতোভয় ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের বড় বেশি প্রয়োজন আজ। তার মৃত্যুতে সৃষ্ট শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। দেশের রাজনীতিতে তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। একজন সফল রাজনীতিক ও সফল মেয়র হিসেবে মোহাম্মদ হানিফ আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

হাবিবুল ইসলাম সুমন : জনসংযোগ কর্মকর্তা, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মেমেরিয়াল ফাউন্ডেশন