ম্যারাডোনার ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রেরণাদায়ক
jugantor
ম্যারাডোনার ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রেরণাদায়ক

  প্রদীপ সাহা  

৩০ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবলের অমর জাদুকর ম্যারাডোনা আর নেই- আচমকা এমন একটি খবরে থমকে গেছে গোটা ফুটবল দুনিয়া। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে কিংবদন্তি এই ফুটবলার বিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থককে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেলেন এক মহাকাব্যিক ইতিহাস। জানা যায়, নভেম্বরের প্রথমদিকে তার মস্তিষ্কে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। মস্তিষ্কে জমাট বেঁধে থাকা রক্ত সফলভাবে অপসারণ করা হলেও অ্যালকোহলে আসক্তি নিয়ে তিনি ভীষণ সমস্যায় ভুগছিলেন। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। পেটে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের জন্য গত বছর জানুয়ারিতে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের সময়ও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ফুটবলের সবুজ গালিচায় দিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন বাম পায়ের এক নিখুঁত চিত্রকর। আর্জেন্টিনার কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘ফুটবল ঈশ্বর’। তিনি ছিলেন ফুটবল আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলার মাঠে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলে ম্যারাডোনা নিজেকে ভীষণ জনপ্রিয় এক ফুটবলার হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। অনেক বিশেষজ্ঞ, ফুটবল সমালোচক, সমর্থক ও খেলোয়াড় তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তিনি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব পেয়েছিলেন পেলের সঙ্গে যৌথভাবে।

আর্জেন্টিনার হয়ে ম্যারাডোনা চারটি বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি ৯১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলে গোল করেছেন ৩৪টি। শুধু ফুটবলার হিসেবেই নয়, কোচ হিসেবেও ম্যারাডোনার নাম আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। ফুটবল জীবনে তিনি যেমন দাপিয়ে খেলেছেন, তেমনি খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার ১১ বছর পর ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচিংও করেছিলেন।

ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতান। সেবার তিনি গোল্ডেন বলও জিতেছিলেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে পায়ে আঘাতের পর আঘাত করেও প্রতিপক্ষ আটকাতে পারেনি তাকে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে গিয়ে ছয়জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন এই ফুটবল জাদুকর। সেসময় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার প্রথম গোলটি ছিল বিতর্কিত। দেখা গিয়েছিল, তিনি হাত দিয়ে বলটি জালে জড়িয়েছিলেন। সেই গোলটি সম্পর্কে ম্যারাডোনা বলেছিলেন- ‘ওটা আমার নয়, ঈশ্বরের হাত ছিল।’ সেই ম্যাচে তার দ্বিতীয় গোলটি ছিল চোখ জুড়ানো। একের পর এক ফুটবলারকে কাটিয়ে তিনি গোল করেছিলেন, যা আজও বিশ্বের সব ফুটবল দর্শক মনে রেখেছেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপেও তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু সেরা হতে পারেননি। ১৯৯৭ সালে ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর তিনি কোচিং শুরু করেছিলেন। ম্যারাডোনা খেলেছেন সব নামি-দামি ক্লাবে। স্প্যানিস জায়ান্ট বার্সিলোনা, ন্যাপোলি ও সেভিয়া ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ফুটবল থেকে যখন ষড়যন্ত্র করে ম্যারাডোনাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তখন ম্যারাডোনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষও কেঁদেছিল। ক্ষোভে-দুঃখে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল ম্যারাডোনা সমর্থক অসংখ্য মানুষ।

ম্যারাডোনা শুধু ‘আর্জেন্টিনা’ বা ‘বিশ্বকাপ জয়ী’ ফুটবলারের নাম নয়। ম্যারাডোনার আবির্ভাব কোনো দেশ বা সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মনোমুগ্ধকারী এক বিশ্ব ব্রহ্মচারী। ম্যারাডোনা আর নেই। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড় বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। যতদিন ফুটবল খেলা টিকে থাকবে, ততদিন ম্যারাডোনার ক্রীড়ানৈপুণ্য ভবিষ্যৎ ফুটবল খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক

ম্যারাডোনার ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রেরণাদায়ক

 প্রদীপ সাহা 
৩০ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবলের অমর জাদুকর ম্যারাডোনা আর নেই- আচমকা এমন একটি খবরে থমকে গেছে গোটা ফুটবল দুনিয়া। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে কিংবদন্তি এই ফুটবলার বিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থককে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেলেন এক মহাকাব্যিক ইতিহাস। জানা যায়, নভেম্বরের প্রথমদিকে তার মস্তিষ্কে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। মস্তিষ্কে জমাট বেঁধে থাকা রক্ত সফলভাবে অপসারণ করা হলেও অ্যালকোহলে আসক্তি নিয়ে তিনি ভীষণ সমস্যায় ভুগছিলেন। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। পেটে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের জন্য গত বছর জানুয়ারিতে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের সময়ও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ফুটবলের সবুজ গালিচায় দিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন বাম পায়ের এক নিখুঁত চিত্রকর। আর্জেন্টিনার কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘ফুটবল ঈশ্বর’। তিনি ছিলেন ফুটবল আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলার মাঠে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলে ম্যারাডোনা নিজেকে ভীষণ জনপ্রিয় এক ফুটবলার হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। অনেক বিশেষজ্ঞ, ফুটবল সমালোচক, সমর্থক ও খেলোয়াড় তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তিনি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব পেয়েছিলেন পেলের সঙ্গে যৌথভাবে।

আর্জেন্টিনার হয়ে ম্যারাডোনা চারটি বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি ৯১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলে গোল করেছেন ৩৪টি। শুধু ফুটবলার হিসেবেই নয়, কোচ হিসেবেও ম্যারাডোনার নাম আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। ফুটবল জীবনে তিনি যেমন দাপিয়ে খেলেছেন, তেমনি খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার ১১ বছর পর ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচিংও করেছিলেন।

ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতান। সেবার তিনি গোল্ডেন বলও জিতেছিলেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে পায়ে আঘাতের পর আঘাত করেও প্রতিপক্ষ আটকাতে পারেনি তাকে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে গিয়ে ছয়জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন এই ফুটবল জাদুকর। সেসময় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার প্রথম গোলটি ছিল বিতর্কিত। দেখা গিয়েছিল, তিনি হাত দিয়ে বলটি জালে জড়িয়েছিলেন। সেই গোলটি সম্পর্কে ম্যারাডোনা বলেছিলেন- ‘ওটা আমার নয়, ঈশ্বরের হাত ছিল।’ সেই ম্যাচে তার দ্বিতীয় গোলটি ছিল চোখ জুড়ানো। একের পর এক ফুটবলারকে কাটিয়ে তিনি গোল করেছিলেন, যা আজও বিশ্বের সব ফুটবল দর্শক মনে রেখেছেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপেও তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু সেরা হতে পারেননি। ১৯৯৭ সালে ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর তিনি কোচিং শুরু করেছিলেন। ম্যারাডোনা খেলেছেন সব নামি-দামি ক্লাবে। স্প্যানিস জায়ান্ট বার্সিলোনা, ন্যাপোলি ও সেভিয়া ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ফুটবল থেকে যখন ষড়যন্ত্র করে ম্যারাডোনাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তখন ম্যারাডোনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষও কেঁদেছিল। ক্ষোভে-দুঃখে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল ম্যারাডোনা সমর্থক অসংখ্য মানুষ।

ম্যারাডোনা শুধু ‘আর্জেন্টিনা’ বা ‘বিশ্বকাপ জয়ী’ ফুটবলারের নাম নয়। ম্যারাডোনার আবির্ভাব কোনো দেশ বা সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মনোমুগ্ধকারী এক বিশ্ব ব্রহ্মচারী। ম্যারাডোনা আর নেই। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড় বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। যতদিন ফুটবল খেলা টিকে থাকবে, ততদিন ম্যারাডোনার ক্রীড়ানৈপুণ্য ভবিষ্যৎ ফুটবল খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক