ভাসানচরে পরিকল্পিত আবাসন
jugantor
ভাসানচরে পরিকল্পিত আবাসন
রোহিঙ্গাদের অবশ্যই যেতে হবে সেখানে

  সম্পাদকীয়  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্থায়ী বসবাসের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে নির্মিত হয়েছে এক মনোরম আশ্রয় কেন্দ্র। এক কথায়, রোহিঙ্গাদের জীবনমান বদলে দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে সেখানে।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সেখানে যে পরিকল্পিত আবাসন তৈরি করা হয়েছে, তাতে রয়েছে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, থানা, বাজার, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, এতিমখানা, ডে-কেয়ার সেন্টার ও সুপারশপের জন্য রয়েছে পৃথক ভবন। পুরো প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রিত হবে সিসি ক্যামেরা দ্বারা। ৩ হাজার ১শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পটিতে ছবির মতো করে সাজানো হয়েছে ঘরবাড়ি, মাঠ, জলাধারসহ ম্যানগ্রোভ বন।

ভাসানচর আবাসন প্রকল্পের পরিচালক নৌবাহিনীর কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে ভাসানচরের এ এলাকা। যুগান্তরের পক্ষ থেকেও ভাসানচরে ঘুরে দেখা গেছে, চারটি উন্নত ওয়্যারহাউসে খাবার মজুদ চলছে, এ খাবার দিয়ে ১ লাখ মানুষের তিন মাসের খাবার নিশ্চিত করা যাবে। ইতোমধ্যেই সেখানে ১০০ টনের উপর খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছেছে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ভাসানচর তো প্রস্তুত হল; প্রশ্ন হচ্ছে, তারা সেখানে যাবে কবে? জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ ভাসানচরে যেতে রাজি নয়। কেন এই অনীহা, তা বোধগম্য নয়। আমাদের কথা হল, রোহিঙ্গারা সেখানে যেতে না চাইলে তাদের বাধ্য করতে হবে যেতে। প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের কাউন্সেলিং করে ভাসানচরের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করতে হবে। রোহিঙ্গারা বর্তমানে যেখানে রয়েছে, তার চেয়ে অনেক উন্নত এই আশ্রয় কেন্দ্র।

দ্বিতীয় কথা, ভাসানচরে রোহিঙ্গারা চাইলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত হতে পারবে। সরাসরি তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও নৌবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সেখানে রয়েছে, যেখানে তারা যুক্ত হতে পারবেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গবাদিপশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, মাছ চাষ, ফল ও ফসলের চাষ এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। ইতোমধ্যে সেখানে ১০ হাজার মহিষ, কয়েকশ’ ভেড়া, রাজহাঁস, দেশি হাঁস, মুরগি এনেছে নৌবাহিনী। বিভিন্ন ফল ও ফসলের বাগানও তৈরি করে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তারা আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজার ও টেকনাফে। গত তিন বছরে রোহিঙ্গারা সেখানে নানা সমস্যা তৈরি করেছে। পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতিসহ নিরাপত্তার সংকট দেখা দিয়েছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই নানা ধরনের সামাজিক অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের অবশ্যই ভাসানচরে যেতে হবে।

অবশ্য এটা হল অস্থায়ী সমাধান। মূল যে সমস্যা তা হল, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন। এত অধিকসংখ্যক রোহিঙ্গা বছরের পর বছর বাংলাদেশে পড়ে থাকবে তা হতে পারে না। মিয়ানমারকে তাদের ফেরত নিতে হবে অবশ্যই। আমরা লক্ষ করছি, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে নানা ধরনের টালবাহানা করছে। বিশ্ব জনমত এবং বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে দেশটি এক চরম স্বেচ্ছাচারী মনোভাব দেখিয়ে চলেছে।

এ অবস্থায় দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ যা করছে, তা যথেষ্ট। কিন্তু আর নয়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত হবে বাংলাদেশকে ভারমুক্ত করতে সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসা।

ভাসানচরে পরিকল্পিত আবাসন

রোহিঙ্গাদের অবশ্যই যেতে হবে সেখানে
 সম্পাদকীয় 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্থায়ী বসবাসের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে নির্মিত হয়েছে এক মনোরম আশ্রয় কেন্দ্র। এক কথায়, রোহিঙ্গাদের জীবনমান বদলে দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে সেখানে।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সেখানে যে পরিকল্পিত আবাসন তৈরি করা হয়েছে, তাতে রয়েছে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, থানা, বাজার, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, এতিমখানা, ডে-কেয়ার সেন্টার ও সুপারশপের জন্য রয়েছে পৃথক ভবন। পুরো প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রিত হবে সিসি ক্যামেরা দ্বারা। ৩ হাজার ১শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পটিতে ছবির মতো করে সাজানো হয়েছে ঘরবাড়ি, মাঠ, জলাধারসহ ম্যানগ্রোভ বন।

ভাসানচর আবাসন প্রকল্পের পরিচালক নৌবাহিনীর কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে ভাসানচরের এ এলাকা। যুগান্তরের পক্ষ থেকেও ভাসানচরে ঘুরে দেখা গেছে, চারটি উন্নত ওয়্যারহাউসে খাবার মজুদ চলছে, এ খাবার দিয়ে ১ লাখ মানুষের তিন মাসের খাবার নিশ্চিত করা যাবে। ইতোমধ্যেই সেখানে ১০০ টনের উপর খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছেছে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ভাসানচর তো প্রস্তুত হল; প্রশ্ন হচ্ছে, তারা সেখানে যাবে কবে? জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ ভাসানচরে যেতে রাজি নয়। কেন এই অনীহা, তা বোধগম্য নয়। আমাদের কথা হল, রোহিঙ্গারা সেখানে যেতে না চাইলে তাদের বাধ্য করতে হবে যেতে। প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের কাউন্সেলিং করে ভাসানচরের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করতে হবে। রোহিঙ্গারা বর্তমানে যেখানে রয়েছে, তার চেয়ে অনেক উন্নত এই আশ্রয় কেন্দ্র।

দ্বিতীয় কথা, ভাসানচরে রোহিঙ্গারা চাইলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত হতে পারবে। সরাসরি তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও নৌবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সেখানে রয়েছে, যেখানে তারা যুক্ত হতে পারবেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গবাদিপশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, মাছ চাষ, ফল ও ফসলের চাষ এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। ইতোমধ্যে সেখানে ১০ হাজার মহিষ, কয়েকশ’ ভেড়া, রাজহাঁস, দেশি হাঁস, মুরগি এনেছে নৌবাহিনী। বিভিন্ন ফল ও ফসলের বাগানও তৈরি করে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তারা আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজার ও টেকনাফে। গত তিন বছরে রোহিঙ্গারা সেখানে নানা সমস্যা তৈরি করেছে। পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতিসহ নিরাপত্তার সংকট দেখা দিয়েছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই নানা ধরনের সামাজিক অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের অবশ্যই ভাসানচরে যেতে হবে।

অবশ্য এটা হল অস্থায়ী সমাধান। মূল যে সমস্যা তা হল, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন। এত অধিকসংখ্যক রোহিঙ্গা বছরের পর বছর বাংলাদেশে পড়ে থাকবে তা হতে পারে না। মিয়ানমারকে তাদের ফেরত নিতে হবে অবশ্যই। আমরা লক্ষ করছি, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে নানা ধরনের টালবাহানা করছে। বিশ্ব জনমত এবং বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে দেশটি এক চরম স্বেচ্ছাচারী মনোভাব দেখিয়ে চলেছে।

এ অবস্থায় দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ যা করছে, তা যথেষ্ট। কিন্তু আর নয়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত হবে বাংলাদেশকে ভারমুক্ত করতে সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসা।